জামিনে মুক্তি পেয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল হাসান (সাদ্দাম) বাগেরহাটের জেলারের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ চাওয়ার’ অভিযোগ তুলেছেন।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর বাগেরহাটে পৌঁছান জুয়েল। এ সময় স্ত্রী-সন্তানের কবর জিয়ারত করে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ওই অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেলার খোন্দকার মো. আল-মামুন।
গ্রেপ্তারের পর গত বছরের ৬ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে জুয়েল হাসানকে (সাদ্দাম) বাগেরহাট জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। ২২ জুলাই ২০২৫ বাগেরহাট থেকে তাঁকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানন্তর করা হয়। তবে জামিনে মুক্তি পেয়ে বাগেরহাটের জেলারের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে জুয়েল বলেন, ‘বাগেরহাটের জেলার আমার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করেছে যে যদি বাগেরহাট থাকতে হয়, পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কারাগারে ঢোকার পর থেকে, আগের থেকে আমার বাগেরহাটের সংসদ সদস্য তন্ময় ভাই (বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ তন্ময়) আমার পরিবারের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিছে। জেলে আমার পিসির টাকা, জামিনের টাকা, সম্পূর্ণ আমার ভাই...।’
নিজেকে ‘নির্দোষ’ এবং রাজনৈতিক বন্দী’ দাবি করে জুয়েল বলেন, ‘আমার স্ত্রী অনেক হতাশাগ্রস্ত ছিল। আমাকে তিনটে মাস সেলে রাখা হয়েছে, সেল বন্দী।’
তবে কারা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, ওই বন্দী শুরু থেকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। বিভিন্নজনকে গালাগাল এমনকি মারধরও করেছেন। নিরাপত্তার জন্য তাঁকে সেলে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে চলাচলটা সংরক্ষিত থাকে। সেল কোনো শাস্তির জায়গা নয়।
কারাগারের জেলার খোন্দকার মো. আল-মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আচরণের কারণেই তাঁকে যশোরে পাঠানো হয়েছিল। এখানে অন্য কোনো ঘটনা নেই। আর জেলার চাইলেই কাউকে অন্য জেলে স্থানন্তর করতে পারেন না। এ ধরনের ভিত্তিহীন কথার আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
বাগেরহাট কারাগারের নথি অনুযায়ী, বন্দী অবস্থায় গত বছরের ১২ এপ্রিল জুয়েল একজন সেল ইনচার্জকে (বাদশা মিয়া) হুমকি দেন ও গালাগাল করেন। ৬ জুলাই অপর এক বন্দীকে মারধর করেন।
জেলার মো. আল-মামুন বলেন, বাগেরহাট কারাগারে আসার পরদিন ৭ এপ্রিল সাদ্দামের স্ত্রী, শ্বশুরসহ আত্মীয়রা এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যথারীতি সাক্ষাৎ চালু ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে তাঁর পারিবারে। এটা কেন্দ্র করে তিনি এখন বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার ও পাঁচ লাখ টাকার একটি অযৌক্তিক, অহেতুক, হয়রানিমূলক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা বলে বেড়াচ্ছেন। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন ঘটে থাকলে তিনি যখন যশোর গেছেন, তখনই বলতে পারতেন।’
স্ত্রী-সন্তানের কবর জিয়ারতের পর গতকাল জুয়েল হাসান সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করেন। সেখান থেকে প্রথম মোটরসাইকেল এবং পরে সাদা একটি গাড়িতে করে অন্যত্র চলে যান।
বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে জুয়েল হাসানের বাড়ি। ২৩ জানুয়ারি সেখান থেকে তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা (২২) ঝুলন্ত মরদেহ ও তাঁর ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসানের (নাজিফ) মরদেহ উদ্ধার হয়। প্রথমে স্বজন ও পরিবারের দাবি ছিল, ছেলেকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন কানিজ সুবর্ণা।
পরের দিন বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের মরদেহ লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। প্যারোলে মুক্তি না পাওয়ায় কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন জুয়েল।
এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। স্ত্রী–সন্তানের মৃত্যুতে সাদ্দামকে কেন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।