মারা গেছে পাখির ছানা। সোমবার দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে
মারা গেছে পাখির ছানা। সোমবার দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে

গাছ কাটতেই মাটিতে পড়ল শামুকখোলের বাসা, মারা গেল ছানা, ভাঙল ডিম

সকাল থেকেই একটানা করাতের শব্দ। করতোয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছের ডালে তখনো শামুকখোল পাখিদের আনাগোনা। কোনোটি বাসায় ফিরছে, কোনোটি খাবারের খোঁজে উড়ে যাচ্ছে। গাছের মগডালে থাকা বাসাগুলোতে ছিল ডিম ও ছোট ছোট ছানা।

গত শনিবার সকাল থেকে সেই গাছগুলোতে চলতে থাকে ব্যাটারিচালিত হাইড্রোলিক করাত। একে একে গাছের ডাল কাটা হয়, তারপর গাছ পড়ে মাটিতে। আছড়ে পড়ে শামুকখোলের বাসা।

ঘটনাটি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, শনিবার থেকে পিতরাজ, জলপাইসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাতটি বড় গাছ কাটা হচ্ছে। এসব গাছে শামুকখোলের প্রায় ৭০-৮০টি বাসা ছিল। গাছ কাটার সময় বাসাগুলো মাটিতে পড়ে শতাধিক ডিম ভেঙে গেছে এবং অনেক ছানা মারা গেছে।

সোমবার দুপুরে রামনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, করতোয়া নদীর ডান তীরে কয়েকটি বড় গাছ কাটা হচ্ছে। কেটে ফেলা গাছের নিচে পড়ে আছে ডালপালা। সেসবের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে রয়েছে পাখির ভাঙা বাসার অংশ। কোথাও পড়ে আছে ডিমের খোসা। কোথাও নিথর পড়ে আছে ছোট ছোট ছানা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাছগুলোর মগডালে শামুকখোলের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাসা বেঁধেছিল। গাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে বাসাগুলো নিচে পড়ে যায়। অনেক ডিম ভেঙে যায়, মারা যায় ছানা।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, স্থানীয় আজাহার আলী ও তাঁর ভাইবোনেরা ১৬ শতক জমিতে থাকা সাতটি বড় গাছ বিক্রি করেছেন। একজন কাঠ ব্যবসায়ী শনিবার সকাল থেকে গাছগুলো কাটতে শুরু করেন।

ছানাটি এখনো বেঁচে আছে। সোমবার দুপুরে শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামে

যে গ্রাম ‘পাখি কলোনি’

রামনগর গ্রামের এই গাছগুলো শুধু গাছ নয়, দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পাখিদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সাল থেকে গ্রামটি স্থানীয়ভাবে ‘পাখি কলোনি’ নামে পরিচিত।

উপজেলার পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের প্রায় ৫০০টি গাছে পাখির বাসা রয়েছে। এসব গাছে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার পাখির আবাস। শামুকখোল ছাড়াও অন্তত ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির পাখি এখানে বসবাস করে।

স্থানীয় কৃষক কাজেম আলী আকন্দ বলেন, পাখির ছানার কিচিরমিচির শব্দে তাঁদের ঘুম ভাঙে। পাখির জন্যই গ্রামটি অন্য রকম। পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই গ্রামে আসেন।

কেটে ফেলা গাছ। সোমবার দুপুরে শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামে

পাখির আবাস রক্ষায় আইন আছে

পাখির আবাসস্থল ও পাখি থাকা অবস্থায় অমানবিকভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে বলে জানান পরিবেশ প্রতিরক্ষা সংস্থার সভাপতি সোহাগ রায়। তিনি বলেন, তবে পাখির কলোনিতে গাছ সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিপূরণের কোনো কার্যকর বিধিমালা বর্তমানে নেই।

গাছ কাটার কারণে শামুকখোলের ডিম ভেঙে যাওয়া ও ছানা মারা যাওয়ার বিষয়টি শুনেছেন বলে জানান শেরপুর বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সালাউদ্দিন পারভেজ। তাঁর ভাষ্য, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গাছ কাটার ক্ষেত্রে তাঁদের সরাসরি বাধা দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা নেই।

এ ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু।