দিনভর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা গাজীপুর নগরীতে সন্ধ্যা হলেই নেমে আসে মশার যন্ত্রনা। মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী। কয়েল, স্প্রে কিংবা অন্য কোনো উপায় যেন স্বস্তি মিলছে না। বছরের পর বছর একই সমস্যায় ভোগান্তি পোহালেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।
এদিকে নগরবাসীকে মশার উৎপাত থেকে রক্ষায় নগর কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরের বাসিন্দাদের। শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও গাজীপুর জজকোর্টের আইনজীবী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এক মাসের বেশি সময় হয়েছে তাঁদের এলাকায় মশার ওষুধের নামের ধোঁয়া ছেড়ে গেছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এরপর সিটি করপোরেশনের কাউকে তাঁদের এলাকায় মশার ওষুধ দিতে দেখা যায়নি। এলাকার নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করলে হয়তো কিছুটা উপকার মিলত।
নগরীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত নালা ও নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা হচ্ছে। জমে থাকা নোংরা পানি পরিণত হচ্ছে মশার প্রজননক্ষেত্রে। সিটি করপোরেশনের অধীন বেশ কিছু এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো কার্যত অকার্যকর। ফলে নগরজুড়ে স্থির পানি আর পচা আবর্জনা মশার উপদ্রব বাড়াচ্ছে। এমনকি শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতেও মশার উপদ্রব থেকে রেহাই নেই। অনেক পরিবার দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। মশারি, কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট কিংবা স্প্রে কোনোটিই যেন স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ী সড়ক, শিববাড়ী মোড়, জয়দেবপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, চান্দনা চৌরাস্তা, দক্ষিণ ছায়াবীথি, হাড়িনাল ও টঙ্গীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সড়কের পাশে ও খোলা জায়গায় স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। অনেক স্থানে ড্রেন উপচে পড়ে ময়লা পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়েছে। জমে থাকা এসব পানিতে অসংখ্য মশার লার্ভা দেখা গেছে।
শিববাড়ী এলাকার বাসিন্দা কলেজশিক্ষক আফসার উদ্দিন খান বলেন, সন্ধ্যা নামলেই ঘরে বসে থাকা যায় না। ড্রেন পরিষ্কার না করায় এবং রাস্তার পাশে ময়লা পড়ে থাকায় মশার উৎপাত দিন দিন বাড়ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক সোহেল রানা মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিচ্ছিন্নভাবে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু মশার উপদ্রব কমছে না। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে একযোগে সমন্বিতভাবে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, নির্ধারিত ডাস্টবিন না থাকায় অনেকেই খোলা স্থানে ময়লা ফেলছেন। সিটি করপোরেশনের গাড়ি নিয়মিত না আসায় সেগুলো দিনের পর দিন পড়ে থাকছে।
চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় কয়েকটি খোলা নালায় কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, মশার কয়েল জ্বালিয়েও লাভ হচ্ছে না। বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
বুধবার গাজীপুর সিটি করপোরেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন নতুন প্রশাসক বিএনপির নেতা শওকত হোসেন সরকার। তিনিও নগরীতে মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা করে ব্যাপকভাবে মশার ওষুধ স্প্রে করা হবে। এ ছাড়া নগরীতে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে ক্লিন সিটি এবং আগামী বর্ষায় প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগিয়ে গ্রিন সিটি করা হবে। তিনি আরও বলেন, নগরীতে ১৯টি ছোট-বড় খাল রয়েছে। এই খালগুলো খনন করা হবে। খাল খনন করে পানিপ্রবাহ যদি ঠিক রাখা যায় তবে মশার বংশবিস্তার রোধ করা যাবে।
নগরের ভোগড়া এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বাইরে বসে গল্প করার উপায় থাকে না। বছরের পর বছর কর দিচ্ছি, কিন্তু মশার মতো ন্যূনতম সমস্যার সমাধান পাচ্ছি না।’