ঠাকুরগাঁও-১ (সদর–রুহিয়া–ভূল্লী) আসনের উপনির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও বাড়ছে। প্রচারে বাধা, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা, ভোটারদের প্রভাবিত করতে প্রতিশ্রুতি দেওয়াসহ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে দুই পক্ষই। এসব অভিযোগের কয়েকটি নিয়ে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিও প্রার্থীদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি এবং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই। অন্যদিকে জামায়াতের হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন দেলাওয়ার হোসেন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সভাপতি বর্তমানে ঢাকা মহানগরী (দক্ষিণ) জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারির দায়িত্বে আছেন।
২৯ অক্টোবর এই উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে।
১৩ অক্টোবর রাতে ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের হাজীপাড়া মসজিদে এশার নামাজ আদায় শেষে সড়কে গণসংযোগে গেলে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা জামায়াতের প্রার্থীর প্রচারে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটিকে আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে দেলাওয়ার হোসেনের নির্বাচনী এজেন্ট মোহাম্মদ আলমগীর ১৩ অক্টোবর নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের নির্বাচনী এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রচারসামগ্রী নষ্ট করার অভিযোগ করেছেন। ১৬ অক্টোবর নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি সদর উপজেলার জগন্নাথপুরের খড়কুটুর মোড়ে টাঙানো ধানের শীষের ব্যানার কেটে ফেলার অভিযোগ করেন। পরদিন ১৭ অক্টোবর ভূল্লী উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ধানের শীষের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা এবং বিএনপির প্রার্থীর ছবি বিকৃত করার অভিযোগও করা হয়।
এসব ঘটনার সঙ্গে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকেরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির নির্বাচনী এজেন্ট। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
১৪ অক্টোবর জামায়াতের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত এবং ধর্মপ্রাণ ভোটারদের উসকানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ করেন পয়গাম আলী।
অভিযোগে বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগের পর নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি ১৯ অক্টোবর দেলাওয়ার হোসেনকে উপস্থিত হয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দিয়েছে।
এর আগে ৯ অক্টোবর বিএনপির প্রার্থী ফয়সল আমীনের বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ করেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর অভিযোগ, গণসংযোগের সময় ফয়সল আমীন মুঠোফোনে সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে একটি সেতু নির্মাণে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। এটিকে ভোটারদের প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এ অভিযোগের পর ১৩ অক্টোবর দেলাওয়ার হোসেনকে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ জমা দিতে নির্দেশ দেয় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবর ফয়সল আমীনকে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। মির্জা ফয়সল আমীনের প্রতিনিধি ইন্তাজুল হক ১৭ অক্টোবর অভিযোগের ব্যাখ্যা দেন। কমিটি পরে অভিযোগের পক্ষে জমা দেওয়া ভিডিও পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, ঘটনাটি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগের। ফলে ওই অভিযোগ থেকে বিএনপির প্রার্থীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিএনপির প্রার্থীর মুঠোফোনে কল দিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে ধানের শীষের নির্বাচনী এজেন্ট পয়গাম আলী বলেন, ‘সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আমাদের অঙ্গীকার। আমরা কোনো উসকানিতে পা দিচ্ছি না। দাঁড়িপাল্লার নিশ্চিত ভরাডুবি বুঝতে পেরে এখন জামায়াতের প্রার্থী ভোটের আগেই মাঠ ছাড়ার কৌশল খুঁজছেন। এ কারণে নানা ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন।’ তাঁর দাবি, ভোটাররা তাঁদের পক্ষে রয়েছেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ বিপুল ভোটে জয়ী হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার জোয়ার দেখে বিএনপির সন্ত্রাসীরা আমাদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছে। আমাদের কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যেতে পারি, সে জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে কমিটির কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে ভোটাররা সরকারদলীয় লোকজনের চাঁদাবাজি, দখল, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রায় দেবেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোথাও সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।