ঝিনাইদহে জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে নিহত কৃষক দলের নেতার লাশ নিয়ে জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল। আজ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে
ঝিনাইদহে জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে নিহত কৃষক দলের নেতার লাশ নিয়ে জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল। আজ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে

ঝিনাইদহে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষে নিহত কৃষক দল নেতার লাশ নিয়ে বিক্ষোভ; জামায়াতের দাবি, ‘মৃত্যু স্ট্রোকে’

ঝিনাইদহে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে নিহত কৃষক দল নেতা তরু মিয়ার মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। আজ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঝিনাইদহ মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে এই বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তাঁরা শহর প্রদক্ষিণ শেষে লাশ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে পাঠান।

এদিকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে স্ট্রোক করে তরু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এলে তা নিশ্চিত হবে।

গতকাল শুক্রবার ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের একটি সভা করা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৮ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের প্রথমে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তরু মিয়াকে (৪৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন চিকিৎসকেরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান তিনি।

নিহত তরু মিয়া ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামের প্রয়াত মনছুর আলী মুন্সির ছেলে এবং গান্না ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গান্না ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, রাতেই নিহত তরু মিয়ার মরদেহ ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয়। সকালে পুলিশ মরদেহ গ্রহণ করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে জেলা বিএনপির নেতারাসহ সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা তালিমের নামে জান্নাত পাওয়ার কথা বলে নারীদের স্বামীর অবাধ্য করে তুলছেন। এতে অনেক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার তেমনই এক অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানান ভুক্তভোগীরা। আর এর প্রতিবাদের নামে জামায়াতের কর্মীরা সংঘর্ষ সৃষ্টি করে তরু মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। তিনি এর বিচার দাবি করেন।

বিক্ষোভ মিছিল শেষে জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, জামায়াতের কর্মীরা তরু মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। তিনি এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

বিক্ষোভ সমাবেশে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান, সহসভাপতি মুন্সি কামাল আজাদ, মুকুল বিশ্বাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ বিশ্বাস, শাহাজান আলী, আসিফ ইকবাল, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, জেলা যুবদলের সভাপতি আহসান কবির, সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সোমেনুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এবং নিহতের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের হামদহ এলাকায় অবস্থিত জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির নেতারা। সেখানে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সদর উপজেলা জামায়াতের আমির মু. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, তরু মিয়ার মৃত্যু হয়েছে স্ট্রোকের কারণে। তরু মিয়া উচ্চ ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগী ছিলেন। সংঘর্ষের সময় মারামারি ও রক্তপাত দেখে তিনি স্ট্রোক করেন। তাঁর গায়ে কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই।

মু. হাবিবুর রহমান আরও বলেন, সংঘর্ষের পর গতকাল বিকেলে গান্না বাজারে জামায়াতের ৬ নেতা-কর্মীর দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। রাতে ইউনিয়নের চণ্ডীপুর এলাকায় জামায়াতের নিরীহ কর্মীদের মারধর ও বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। কোনো মামলা না হলেও পুলিশ জামায়াতের এক নারী কর্মীসহ ৪ জনকে আটক করেছে। পুলিশের ভয়ে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না বলে দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. আবদুল আলীম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. ছগির আহম্মেদ, শহর আমির ইসমাইল হুসাইন, গান্না ইউনিয়ন জামায়াতের আমির জাহাঙ্গীর হোসেন, শহর শিবিরের সভাপতি আল আমিন ও জেলা শিবিরের সভাপতি ওবাইদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, তরু মিয়া যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি বমি করছিলেন। তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় এখানে সময়ক্ষেপণ না করে তাঁকে দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হয়। এখান থেকেই তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলেই তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন বলেন, বিএনপির কর্মী তরু মিয়া নিহতের ঘটনায় তাঁর ছেলে মো. শিপন মিয়া বাদী হয়ে থানায় ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেছেন। মামলায় ৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শাহাদৎ হোসেন বলেন, মামলায় মাধবপুর গ্রামের ফারজেল হোসেনের ছেলে জান্নাতুল ইসলাম (২৪) ও সিরাজুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৫৪) এবং পাইকপাড়া গ্রামের মো. ইউসুফ আলী বিশ্বাসের ছেলে মো. মোকলেচুর রহমান (৫৫) নামের ৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।