সোহাগী জাহান তনু
সোহাগী জাহান তনু

‘অন্ধকার থেকে আলোয়’ তনু হত্যা মামলা, মৃত্যুর আগে বিচার দেখতে চান মা-বাবা

প্রায় অন্ধকারেই হারিয়ে যাচ্ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান ওরফে তনু হত্যা মামলা। অনেকটা ‘খাদের কিনারা থেকে’ মামলার তদন্ত কার্যক্রম আবার আলোর মুখ দেখেছে। হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন করে বিচারে ‘আশার আলো’ দেখছে পরিবার।

তনুর পরিবার বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মামলাটি ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা চলেছে। ঘটনার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার আসামি হাফিজুর রহমানসহ সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন; কিন্তু নামগুলো কখনোই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রকাশ্যে আসেনি। দীর্ঘ এক দশক পর হলেও তনুর খুনিদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেখতে চান তাঁরা।

কুমিল্লার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ‘অদৃশ্য শক্তি’ মামলাটির তদন্ত কার্যক্রমে বাধা দিয়ে রেখেছিল। যে কারণে সত্য কখনো সামনে আসেনি। ১০ বছর পর হলেও সত্য আংশিক প্রকাশ্যে এসেছে। এবার অন্তত মামলায় ‘অদৃশ্য বাধা’ দেখতে চান না তাঁরা।

২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুরকে আটক করেন পিবিআইয়ের সদস্যরা। এরপর তাঁকে তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার বিকেলে কুমিল্লার আদালতে আনা হয়। এ সময় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের আদালতে তাঁকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। বর্তমানে ৫২ বছর বয়সী হাফিজুর রহমান ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গেছেন। তনু হত্যার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন তিনি।

এর আগে ৬ এপ্রিল ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুমিল্লায় আসেন। এ সময় তিনি মামলার অগ্রগতি জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন করেন। আদালত তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন। ওই তিনজনের একজন হলেন হাফিজুর। অন্য দুজন হলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম। তাঁরাও বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন। তবে মামলার বাদী ও তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ হবে। বুধবার কুমিল্লার আদালতে হাজির করার আগেই হাফিজুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। পরদিন তাঁর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।

এই হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে ওই সময়ে তাঁদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি। দীর্ঘ ১০ বছরেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন বা জড়িত ব্যক্তিদের নাম সামনে না আসায় এ নিয়ে ক্ষোভ আর হতাশার শেষ ছিল না পরিবার থেকে শুরু করে কুমিল্লার মানুষের।

বৃহস্পতিবার বিকেলে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতে কী হয়েছে, সেসব নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না; তবে আমরা মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। গ্রেপ্তার হাফিজুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অপর সন্দেহভাজন ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এর বাইরে আপাতত আমরা এসব নিয়ে কথা বলতে চাইছি না। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, তদন্তের মাধ্যমে সব বেরিয়ে আসবে।’

মেয়ে হত্যার বিচার দেখার আশায় দিন কাটানো তনুর মা–বাবা মৃত্যুর আগে দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখতে চান। বৃহস্পতিবার তনুর মা আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই কইছে বিচার পাইতাম না। তবে আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ছি না। সব সময় আল্লাহর কাছে কইছি—আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে আমারে বিচারডা দেখায়। যাক অবশেষে একটা খুনি ধরা পড়ল। গতকাল কোর্টে খুনিডারে দেইখ্যা মনে একটু শান্তি পাইছি। বাকি খুনিডি গ্রেপ্তার হইলে আরেকটু শান্তি পাইয়াম। আমার তনুরে অনেক কষ্ট দিয়ে মারছে তারা। আমি তারার ফাঁসি চাই। দেশবাসীও দেখতে চায়, তনুর খুনিরার ফাঁসি হইছে। এই জীবনে আর কিছু চাই না, শুধু মাইয়াডার খুনিডির বিচার দেখতাম চাই।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক জাহিদ—এই নামগুলো আমি ঘটনার দিন থেকেই বলে আসছি। আমি তাঁদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু আমাকে সে সময় মামলা করতে দেওয়া হয়নি। সে সময়ের ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সিইও মনিরুল ইসলাম আমাকে কারও নাম উল্লেখ করতে দেননি। তিনি নিজেই অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করে মামলাটি টাইপ করিয়ে আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন। দেশবাসী এখন তনুর খুনিদের ফাঁসি দেখতে চাই। এটাই আমাদের শেষ চাওয়া।’

ইয়ার হোসেন বলেন, ‘১০ বছর ধরে যেখানেই গিয়েছি, মানুষ শুধু বলত, তনু হত্যার বিচার কি হবে না? যাক, অবশেষে বিচার পাব বলে আশায় বুক বেঁধেছি। তবে এই খুনের মূল হোতা সার্জেন্ট জাহিদ। জাহিদ আর তাঁর স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া আরও অনেকে এই খুনে প্রত্যক্ষ ও প্ররোক্ষভাবে জড়িত। আমার বয়স হয়ে গেছে। মৃত্যুর আগে খুনিদের বিচার দেখে যেতে চাই। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার তনু হত্যার বিচারের মাধ্যমে “আইন সবার জন্য সমান” কথাটি প্রতিষ্ঠিত করবে।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘তনু আমার একমাত্র আদরের বোন। একটা সময় মনে হয়েছিল, তাঁর খুনের বিচার হয়তো পাব না। যাক অবশেষে বিচারে আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আমরা কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের বিচার নয়, অপরাধীর বিচার চাই। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনি জাহিদও গ্রেপ্তার হবেন।’

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিয়ে আশাবাদী কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর) কাইমুল হক (রিংকু)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৭ সালেই সন্দেভাজনদের গ্রেপ্তার ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সে সময় সবকিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। “আইন সবার জন্য সমান”—এটা বর্তমান সরকারের সময়ে এসে প্রমাণিত হলো।’

তনু হত্যার বিচারে নতুন করে আশার আলো দেখছেন উল্লেখ করে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই না অতীতের মতো অদৃশ্য কোনো চাপে বা বাধায় আবারও মামলাটি অন্ধকারে হারিয়ে যাক। বিচারহীনতা সমাজে অপরাধ বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি আশা করব, দ্রুত অপর সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনা হবে।’