
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিনটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে প্রকাশিত ডিজিটাল লটারির ফলাফলে ১০ শিক্ষার্থীর নাম ৫৭ বার এসেছে। এর মধ্যে মেধাতালিকায় ৪৩ বার ও অপেক্ষমাণ তালিকায় এসেছে ৩৩ বার। শিক্ষার্থীদের জন্মনিবন্ধন নম্বরের মাঝের দু-চারটি সংখ্যা পাল্টে অনলাইনে আবেদন করায় এমন ফলাফল এসেছে। ফলাফল ঘেঁটে, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সম্প্রতি মাউশি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, গভ. মডেল গার্লস হাইস্কুল ও সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির লটারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই ফলাফলে এমন জালিয়াতি ধরা পড়ে। যেসব শিক্ষার্থী জালিয়াতি করে বারবার আবেদন করেছে, তাদের ভর্তি না করার নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জুলফিকার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মাউশি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত সব প্রধান শিক্ষকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত হলো, যারা জন্মনিবন্ধন নম্বর ছলচাতুরীর মাধ্যমে পরিবর্তন করে একাধিকবার আবেদন করেছে, যাচাই-বাছাইয়ে জালিয়াতি ধরা পড়লে তাদের ভর্তি বাতিল করা হবে।
অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা নাজমীন প্রথম আলোকে বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ডিজিটাল লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির ফলাফলে অনেকের নাম একাধিকবার এসেছে। এ জন্য অভিভাবকেরাই দায়ী। ভর্তির ফলাফলে যাদের নাম একাধিকবার এসেছে, তাদের ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতারণা করে আবেদন করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে না।
ভর্তির ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির লটারির ফলে এক শিক্ষার্থীর নাম ১১ বার এবং আরও দুই শিক্ষার্থীর নাম ৮ বার করে এসেছে। এর মধ্যে প্রথম শিক্ষার্থীর নাম মেধাতালিকায় সাতবার ও অপেক্ষমাণ তালিকায় চারবার এসেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিক্ষার্থীর নাম মেধাতালিকায় এসেছে পাঁচবার করে ও অপেক্ষমাণ এসেছে তিনবার। শহরের গভ. মডেল গার্লস হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তির লটারির ফলে এক শিক্ষার্থীর নাম ১৪ বার এবং আরেক শিক্ষার্থীর নাম এসেছে ৫ বার। এর মধ্যে প্রথম শিক্ষার্থীর নাম মেধাতালিকায় ১০ বার ও অপেক্ষমাণ তালিকায় ৪ বার করে এসেছে। দ্বিতীয় শিক্ষার্থীর নাম মেধাতালিকায় এসেছে পাঁচবার। শহরের সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৬ শিক্ষার্থীর নাম ৪৩ বার এসেছে। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীর নামই এসেছে ১৯ বার। এর মধ্যে মেধাতালিকায় এসেছে ৩০ বার ও এক শিক্ষার্থীর নাম অপেক্ষমাণ তালিকায় এসেছে ১৩ বার।
ওই ১০ শিক্ষার্থীর ফলাফল ঘেঁটে দেখা গেছে, একাধিকবার নাম আসা শিক্ষার্থীদের বাবা ও মায়ের নাম একই থাকলেও মুঠোফোন নম্বরে ভিন্নতা রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ছবি, পোশাক ও চুল ছোট-বড় ছিল। জন্মনিবন্ধন নম্বরের ১৭ সংখ্যার মধ্যে প্রথম ৯টি ও শেষের ৪ থেকে ৫টি সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে মাঝের সংখ্যাগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে।
শহরে অনলাইনে আবেদন করেন এমন কয়েকজন দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আসলে জন্মনিবন্ধন নম্বরের মাঝের সংখ্যা পরিবর্তন করে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তাই এমন ফলাফল এসেছে। অভিভাবকদের অনুরোধে তাঁরা এমন করেছেন। তবে আগামী দিনে এভাবে কারও আবেদন করবেন না বলে জানান তাঁরা।
এ বিষয়ে একাধিকবার আবেদন করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে ভর্তির আবেদনে এক শিক্ষার্থীর নাম একাধিকবার আসার পর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে মাউশি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা ফলাফলের মেধাতালিকার ক্রমানুসারে ১৮ থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হবে। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের ২২ থেকে ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে ভর্তি হতে হবে। ভর্তির সময় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই, জন্মনিবন্ধনের মূল কপি ও অনলাইন কপি যাচাই করতে হবে, মাতা–পিতার জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি ভালো করে দেখতে হবে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোনো শিক্ষার্থী নির্বাচিত হলে যাচাই সাপেক্ষে তাকে ভর্তি করা যাবে না। একই শিক্ষার্থী অনলাইনে জন্মনিবন্ধন নম্বর বারবার পরিবর্তন করে একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে থাকলে জালিয়াতির কারণে তাকে ভর্তি করানো যাবে না।
জেলা প্রশাসক মো. শাহ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা ও আইসিটি) দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। জন্মনিবন্ধন নম্বর পরিবর্তন করে আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরেও এসেছে। শিক্ষাসচিবকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন প্রতারণা না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে জানাব।’