আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর নেভানোর চেষ্টা করছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। রোববার বিকেলে ভোলা শহরের চকবাজার এলাকায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর নেভানোর চেষ্টা করছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। রোববার বিকেলে ভোলা শহরের চকবাজার এলাকায়

খালের পাড়েই দোকান, ঘাট দখল হওয়ায় পানি তুলতে দেরি, পুড়ল ব্যবসায়ীর সম্বল

খালের পাড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছেছিল, পানি ছিল হাতের কাছেই। তবু আগুন নেভাতে সেই পানি তোলা যায়নি। কারণ, যেখান থেকে জরুরি সময়ে পানি তোলার কথা, সেই ঘাটলাগুলোই দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট। ফলে দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ মিনিট পানির জন্য হাহাকার করতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। আর সেই মূল্য দিতে হয়েছে এক ব্যবসায়ীকে।

গতকাল রোববার বিকেলে ভোলা শহরের ব্যস্ত চকবাজার এলাকায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ‘শাড়ি বিতান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দুটি গুদাম।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ঘটনার পর শহরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ভোলা শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্ত ভোলা খালের ঘাটলা ও তীর অবৈধ দখলে চলে যাওয়ার পরও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। খাল দখলের পর থেকে বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেই পানিসংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

ধোঁয়া থেকে দাউ দাউ আগুন, তারপর অপেক্ষা

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার বিকেলে চকবাজারের শাড়ি বিতান ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকা গুদাম থেকে প্রথমে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, দোকানকর্মী ও আশপাশের লোকজন প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় তারা দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন।

দুই পাড় দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনার কারণে ভোলা খালের কাছে পৌঁছানোই কঠিন। আজ সোমবার রাতে ভোলা শহরের চকবাজার এলাকায়

খবর পেয়ে ভোলা জেলা ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছেই ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সমস্যায় পড়েন। ভবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল থেকে দ্রুত পানি তোলার কথা থাকলেও সেখানে মেশিন বসানোর জায়গা কার্যত বন্ধ। পুরোনো ঘাটলা দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করায় প্রথম ১৫–২০ মিনিট কোনোভাবেই পানি তোলা সম্ভব হয়নি। পরে বিকল্প ব্যবস্থা করে প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

পানি পেলে আগুন এত দূর যেত না

শাড়ি বিতানের মালিক মো. সোহেল বলেন, আগুনে তার ছোট ও বড়—দুটি গুদামে থাকা বিপুল পরিমাণ শাড়ি, কাপড় ও অন্যান্য মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য, এতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

ভোলা জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. লিটন আহম্মদ জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তাঁর মতে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৫–২০ লাখ টাকার মতো হতে পারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ফায়ার সার্ভিস যদি শুরুতেই খাল থেকে দ্রুত পানি তুলতে পারত, তাহলে আগুন আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক কমে আসত।

ভোলা শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্ত ভোলা খাল এখন দখল–দূষণে বিপর্যস্ত

চকবাজার বস্ত্র মালিক সমিতির সভাপতি মফিজুল ইসলাম বলেন, একসময় ভোলা পৌরসভার চেয়ারম্যান গোলাম নবী আলমগীর খালের দুই পাশে দুটি ঘাটলা তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, বাজারে মালামাল ওঠানামা এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিস যেন দ্রুত পানি তুলতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ঘাটলাগুলো বন্ধ করে সেখানে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মফিজুল ইসলামের ভাষায়, ‘ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে ১৫-২০ মিনিট পানি তুলতে পারেনি। আগুন কি ১৫-২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকবে? এই সময়েই সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু চকবাজার নয়, পাদুকাপট্টি, মনিহারি পট্টি, জিয়া মার্কেট—পুরো বাজারের নিরাপত্তার স্বার্থে খালের তীরের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে হবে, ঘাটলা উদ্ধার করতে হবে, খালও খনন করতে হবে।’

স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী মোছলেহ উদ্দিন বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস আসার পর যদি সঙ্গে সঙ্গে পানি পেত, তাহলে আগুন আরও অন্তত ২০ মিনিট আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা যেত। মেশিন বসানোর জায়গা বন্ধ করে দোকান বানানোর ফলেই এই বিপুল ক্ষতি হলো।’ তিনি আরও বলেন, খাল দখলের পর থেকে বাজারে যতবার আগুন লেগেছে, ততবারই পানিসংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর নেভানোর চেষ্টা করছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। রোববার বিকেলে ভোলা শহরের চকবাজার এলাকায়

উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে প্রশ্ন

ভোলা খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবিতে উচ্চ আদালতে মামলা করেছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংগঠনটির বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন জানান, আদালত থেকে জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়রকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশও দেওয়া হয়। এরপর কিছু ভাঙচুর হলেও পূর্ণাঙ্গ উচ্ছেদ আর হয়নি। মামলাটি এখনো আদালতে চলমান।

অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোলা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিনও। তাঁর দাবি, খালের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে ভোলা পৌরসভাই রাস্তাঘাট ও দোকানঘর নির্মাণ করেছে। আদালত বা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ এলে প্রশাসন কিছুদিন উচ্ছেদের তৎপরতা দেখালেও পরে তা স্তিমিত হয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘এটা কার্যত উচ্ছেদের নামে নাটক। ইচ্ছে করলে প্রশাসন মুহূর্তেই দখল সরাতে পারে।’

এ বিষয়ে ভোলা জেলা প্রশাসক শামীম রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন এবং খতিয়ে দেখবেন। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলে কোথায় কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের সমস্যা না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তবে যেহেতু বিষয়টির সঙ্গে আদালতের নির্দেশ ও মামলার বিষয় জড়িত থাকতে পারে, তাই সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘাটলা ভরাট করে দোকান বানানোর ঘটনাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর। তিনি বলেন, বাজারের নিরাপত্তা ও মালামাল ওঠানামার সুবিধার জন্যই তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে ঘাটলাগুলো করেছিলেন। পরে সেই জায়গা ভরাট করে দোকান বসানো হয়েছে। প্রশাসন জায়গাটি উদ্ধার করে দিলে জেলা পরিষদের তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করে তিনি আবারও সেখানে পানি ওঠানামার সুন্দর ব্যবস্থা ও খোলা জায়গা তৈরি করবেন বলে আশ্বাস দেন।