
শতাব্দীপ্রাচীন বসতি, জমি দখল ও নানাবিধ কারণে চরম অস্তিত্ব ও জীবনযাত্রার সংকটে রয়েছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কলাপাড়ায় আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়। সেখানে বসবাসরত রাখাইন জনগোষ্ঠীর জীবনমানের সার্বিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সমস্যা সরেজমিনে দেখল নাগরিক অধিকার সংগঠন ‘সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস’–এর একটি প্রতিনিধিদল।
শনিবার সকাল থেকে নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মিশ্রিপাড়া, নয়াপাড়া, গোড়া আমখোলা পাড়া, কেরানীপাড়া ও মেথাওপাড়া পরিদর্শন করেন। এ সময় রাখাইন সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা তাঁদের ভূমি সংকট ও বেদখল, অস্তিত্বসংকট, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং ঐতিহাসিক স্থানের ক্ষতিসহ বিভিন্ন সমস্যা নাগরিক প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরেন।
নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ‘ল্যান্ড ইজ লাইফ’ এশিয়ার কর্মসূচি পরিচালক সতেজ চাকমা রাখাইনদের নানা সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রাখাইন আদিবাসীরা জমি হারাতে হারাতে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। রাখাইনদের মৃত্যুর পর মরদেহ যে সমাহিত করবে, তাদের শ্মশানভূমিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী বাঙালিরা যুক্ত। আমরা এ জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি।’
সতেজ চাকমা জানান, ২০২১ সালে পায়রা বন্দর কর্তৃক উচ্ছেদকৃত ছআনি পাড়া গ্রামের ছয়টি পরিবারকে এখনো পুনর্বাসন করা হয়নি। তাঁদেরকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, পুনর্বাসনের আগপর্যন্ত মাসিক পাঁচ হাজার টাকা হারে সহায়তা দেওয়া হবে। এ টাকা ছয় মাস দেওয়ার পর আর দেওয়া হয়নি এবং এ পরিবারগুলো এখন কষ্ট করে জীবন যাপন করছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারকে এখনো পুনর্বাসন করেনি।
প্রতিনিধিদল জানায়, কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের জমিও দখল করা হচ্ছে। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত এ বিহারের ২ একর ৪৪ শতাংশ জমি থেকে দখল হতে হতে এখন বিহারের দখলে আছে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমি। অন্যদিকে পবিত্র এ বিহারের দেয়াল ঘেঁষে টয়লেট বানিয়ে এর পবিত্রতাও নষ্ট করা হচ্ছে এবং এর জমি দখলের পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রাখাইন অধ্যুষিত বিভিন্ন পাড়া সরেজমিন পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধিদলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, পটুয়াখালী রানের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীসা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুনমুন ইসলাম (ঋতু)।
প্রতিনিধিদলের প্রধান ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ‘রাখাইন জনগোষ্ঠীর সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো আমরা দেখলাম। আসলে এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা হিসেবে রাখাইনরা অনেক সংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রভাবশালীরা রাখাইনদের জমি দখল করে নিয়েছে। তাঁদের বসতঘরের দুরবস্থা দেখলাম। খাদ্যসামগ্রীর সংকট রয়েছে। রাখাইন সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা যাতে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে, সে নিশ্চয়তা দরকার। আমরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এসব সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করব।’
এরপর নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কুয়াকাটা পৌরসভার সম্মেলনকক্ষে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেকের সাথে কলাপাড়া এবং কুয়াকাটার রাখাইন জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলেন।
ইউএনও কাউছার হামিদ রাখাইনদের সমস্যা প্রসঙ্গে জানান, কলাপাড়া-কুয়াকাটায় গড়ে ওঠা সভ্যতার ক্রমবিকাশে রাখাইনরা বড় ভূমিকা পালন করেছে। রাখাইনদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাখাইনদের যেসব সমস্যার কথা নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আমাদের কাছে তুলে ধরেছে, আমরা অবশ্যই সেসব সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করব।’