
হাওরে কৃষকের ভরসা বোরো ধান। উজানের পাহাড়ি ঢল এ ধানের বড় হুমকি। ঢল নামলেই ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙে। তলিয়ে যায় হাওর। ডোবে কৃষকের শ্রমে–ঘামে ফলানো সোনার ধান। কিন্তু এবার তেমন ঢল নামেনি, ভাঙেনি বাঁধও। তবু কৃষকের বুক ভেঙেছে, ডুবেছে ধান। হাওরে এখন ফসলহারা কৃষকের হাহাকারের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে বাঁধের কার্যকারিতা নিয়ে। চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাঁধ দিয়ে যে আর ফসল রক্ষা পাবে না, এবার এটা বোঝা গেছে। বাঁধ লাগবে, সঙ্গে বিকল্প ভাবতে হবে। উজানের পানি ভাটিতে নির্বিঘ্নে নামার পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। হাওর ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে পরিবর্তন। না হলে হাওরে কৃষকের কান্না থামবে না।
কৃষক, হাওর আন্দোলন ও হাওর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এতে ভাটিতে থাকা সুনামগঞ্জে ব্যাপক ঢল নামে। ঢলের কবল থেকে হাওরে ফসল রক্ষায় প্রতিবছর শতকোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এ কাজে এখন স্থানীয় প্রশাসনও যুক্ত। এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ হয়েছে। কিন্তু এসব বাঁধ কোথাও ভাঙেনি। তবু ফসল নষ্ট হয়েছে। জলাবদ্ধতায় ডুবেছে হাওর। অনেকেই বলছেন, হাওরে বাঁধ নির্মাণ এখন বড় ‘ব্যবসা’। প্রতিবছর অনেক অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এসব মাটির বাঁধে ক্ষতি হচ্ছে হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের। হাওর ভরাট, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা, নদীপথ সংকুচিত হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের সুযোগ কমে গেছে। দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতার সংকট। জেলা প্রশাসন বলছে, এবার জেলায় ফসলডুবিতে ১ লাখ ২৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক আবদুল মালিক (৮৫) বাপ-দাদার হাত ধরে কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। এখনো হাওরে আছেন। এই কৃষক জানান, বাঁধ নিয়ে এত কথাবার্তা আগে ছিল না। এত বাঁধের দরকারও হতো না। নদীগুলো গভীর ছিল। ঢলের পানি নেমে সহজেই নদী হয়ে ভাটিতে চলে যেত। কোথাও সমস্যা হলে স্থানীয় কৃষকেরাই মিলেমিশে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ দিতেন। হাওরের গভীর অংশে ধানের আবাদ হতো না। এখানে বৃষ্টির পানি আটকে থাকত। হাওর ভরাট হওয়ার কারণে এখন পানিধারণের ক্ষমতা কমে গেছে। আবদুল মালিক বলেন, ‘এখন যেভাইদি চোখ যায়, খালি বাঁধ আর বাঁধ। বাঁধের লাগি ত পানি আটকি থাকে।’
জেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে কাইনকোনা বাঁধ। এখানে প্রতিবছর পাঁচটি প্রকল্পে বাঁধের কাজ হয়। পাশেই নোয়াখাড়া এলাকায় আছে একটি জলকপাট (স্লুইসগেট)। এ হাওরে এলাকার ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের মানুষের জমি। এবার এ হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিলে দক্ষিণ পাড়ের বাঁধ কেটে দেন স্থানীয় কৃষকেরা। এতে উত্তর অংশে পানি বেড়ে যায়। বাঁধ নিয়ে দুই পক্ষে শুরু বিবাদ। এরপর মধ্য এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে হাওরের বেশির ভাগ ফসল তলিয়ে যায়। স্থানীয় নিয়ামতপুর গ্রামের কৃষক শরিয়ত উল্লাহ (৬৭) বলছিলেন, এখন বৃষ্টির পানি হাওর থেকে নামতে পারে না। স্লুইস গেট কোনো কাজে আসে না।
এবার একইভাবে জলাবদ্ধতায় পড়ে দেখার হাওর। এটি জেলার সবচেয়ে বড় ধানের হাওর। ৮ এপ্রিল স্থানীয় কৃষকেরা হাওরের উতারিয়া বাঁধের কিছু অংশ কেটে দেন। পরদিনই প্রশাসন ও পাউবোর চাপে কৃষকেরা আবার সেটি মেরামত করেন। জলাবদ্ধতা বাড়লে কৃষকদের চাপে প্রশাসন আবার বাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তত দিনে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়। পাউবো এবার এখানে বাঁধের ৫টি প্রকল্পে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। অথচ কৃষকেরা পানি নিষ্কাশনের জন্য সেখানে একটি জলকপাট কিংবা রাবার বাঁধ দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন।
উজানের ঢলের পানি ভাটিতে নামতে বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরে ফসলের ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করেন অনেকে। জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলছিলেন, আগে ভয় ছিল বাঁধ, এবার নতুন করে শুরু হয়েছে জলাবদ্ধতার ভয়। এ ভয়ে কৃষিকাজের প্রতি অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
জেলার হাওর ও হাওর এলাকার নদী-নালা এখন যে অবস্থায় আছে সেটি পাঁচ-দশ বছরে হয়নি বলে মনে করেন হাওর-গবেষক আবদুল হাই চৌধুরী। তিনি জানান, উজানের ঢলের সঙ্গে প্রতিবছর প্রচুর পলি আসে। যুগ যুগ ধরে পলি পড়ে হাওর ও নদীর নাব্যতা কমেছে। আবার প্রতিবছর বিপুল মাটির বাঁধ হয়। সে মাটি বর্ষায় আবার হাওরেই যাচ্ছে। এতে সংকট বাড়ছে।
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় হিসাব করে দেখান, ২০১৮ সাল থেকে জেলার হাওরে ফসল রক্ষায় ৭ হাজার ৭৭টি প্রকল্পে ৫ হাজার ৮৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তিনি আরও বলেন, এতেই বোঝা যায় যে বাঁধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কতটা আগ্রহী। বাঁধ ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ ফসল রক্ষার পরিবর্তে উল্টো ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জে বাঁধ পরিদর্শনে এসে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইছার আলম বলেছেন, হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ নিয়ে তাঁরা নতুন করে ভাবছেন। প্রধানমন্ত্রী নদী ও খাল খননের যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে হাওরেও ভবিষ্যতে কাজ হবে।
সংস্থাটির সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার দাবি করেন, বাঁধের সঙ্গে পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে অনেক জায়গায় খাল-নদী ভরাট হয়ে গেছে। লোকজন রাস্তা, স্থাপনা করেছেন। তাই নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন হাওরে কৃষকের পক্ষে কাজ করছেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক চিত্তরঞ্জন তালুকদার (৭০)। এখন সুনামগঞ্জে ‘হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি তিনি। তাঁর ভাষ্য, সংকট থেকে উত্তরণে প্রথম কাজ হচ্ছে, পানিপথের বাধা দূর করা। জেলার পাটলাই, সুরমা, ধনু, বটেশ্বর, গোমাই, কংস নদের যেসব স্থানে পলি পড়ে ভরাট হয়েছে, সেসব স্থান খনন করা। একই সঙ্গে হাওরেও পরিকল্পিত খনন দরকার।
‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’ সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, হাওরে প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। স্থানীয় লোকজন ও বিশেষজ্ঞ মতের সমন্বয়ে প্রকল্প নিতে হবে। তাহলেই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।
হাওরের বাঁধ নিয়ে গবেষণা করছেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা আজিজুর রহমান। তিনি জানান, ১৯৬৮ সাল থেকে হাওরে বাঁধের কাজের শুরু। এসব বাঁধ শুধু ফসলটা নিরাপদে তোলার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে দেওয়া হয়। একসময় ঠিকাদারি প্রথা ছিল। ২০১৭ সালে হাওরডুবির পর কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয় ঠিকাদারদের। এখন কাজ হচ্ছে স্থানীয় কৃষক-সুবিধাভোগীদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। আজিজুর রহমান বলেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম মনে করেন, এবার হাওরে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটি চিন্তায় রেখেই কাজ করতে হবে। হাওরে ধানের সঙ্গে মাছের কথাও ভাবতে হবে। বাঁধে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার মাটির বাঁধ নির্মাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কিছু কিছু জায়গায় প্রকৃতিবান্ধব স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা যায়। হাওর, নদী-নালা খনন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে। তাই হাওর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।