শিল্পীর আঁকা ছবিতে চট্টগ্রামে মুঘল আক্রমণ। শিল্পী আলপ্তগীন তুষারের আঁকা ছবিটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
শিল্পীর আঁকা ছবিতে চট্টগ্রামে মুঘল আক্রমণ। শিল্পী আলপ্তগীন তুষারের আঁকা ছবিটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

যে যুদ্ধে আরাকানিদের হারিয়ে চট্টগ্রাম জয় করেছিল মোগলরা

মধ্যযুগে স্বাধীন সুলতানদের হাত থেকে বাংলা মোগলদের অধীনের চলে যায়। এরপর প্রায় ১০০ বছর ধরে চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে ছিল। ফলে সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক সংযোগ ভেঙে পড়েছিল। আরাকানশাসিত এই অঞ্চল হয়ে ওঠে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। মোগল শাসনের অধীনে থাকা বাংলার বিভিন্ন জনপদে প্রায়ই লুটতরাজ চালাত মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুরা। একসময় ভাবা হতো, চট্টগ্রাম মোগলদের পক্ষে জয় করা অসম্ভব। তবে কয়েক দশকের পরিকল্পনা আর রণসজ্জার পর ১৬৬৬  সালে এই দিনে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মোগলদের অধীনে আসে।

সুসজ্জিত মোগল রণতরি থেকে মুহুর্মুহু কামানের গোলা আছড়ে পড়ছিল দুর্গপ্রাচীরে। আরাকানি সেনাদের শেষ প্রতিরোধ ভেঙে গেল তাসের ঘরের মতো। বন্দুকের গুলিতে ও কামানের গোলায় মারা পড়ল অনেকে। লড়াইয়ে টেকা যাবে না জেনে ছোট নৌকায় কর্ণফুলীর খাল দিয়ে বহু আরাকানি পালিয়ে গেল। মোগল সেনারা সহজেই দুর্গ দখল করে তাতে আগুন দিল। পতন হলো অজেয় চট্টগ্রামের।

১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মোগলদের অধীনে আসে। নানা ইতিহাসবিদের বিবরণ, শিল্পীদের আঁকা ছবি সম্বল করে ওপরের যুদ্ধের মুহূর্তটুকু রচিত হয়েছে। তবে এই বিবরণের চেয়ে মোগলদের চট্টগ্রাম অভিযান অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত ছিল। প্রায় কয়েক দশকব্যাপী পরিকল্পনা ও দিল্লির সেই সময়কার সম্রাট আওরঙ্গজেবের ধনুর্ভঙ্গ পণের কারণেই আজকের এই দিনে চট্টগ্রাম মোগলদের অধিকারে এসেছিল। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে চট্টগ্রাম দখলের লড়াই যেকোনো দিক থেকেই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ মোড় ঘোরানো ঘটনা।

যে কারণে অভিযান

মধ্যযুগে স্বাধীন সুলতানদের হাত থেকে বাংলা মোগলদের অধীনের চলে যায়। এরপর প্রায় ১০০ বছর ধরে চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে ছিল। তার আগে শতসহস্র বছর ধরে চট্টগ্রামই ছিল বাংলার প্রবেশদ্বার। নানা দেশের মানুষের মিলনকেন্দ্র ছিল এই জনপদ। কিন্তু সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলার সেই ঐতিহাসিক সংযোগ ভেঙে পড়েছিল। তখন ভয়মিশ্রিত এক বিচ্ছিন্ন জনপদ হয়ে দাঁড়ায় এটি। আরাকানশাসিত এই অঞ্চল হয়ে ওঠে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। মোগল শাসনের অধীনে থাকা বাংলার বিভিন্ন জনপদে প্রায়ই লুটতরাজ চালাত মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুরা। বাসিন্দাদের ধরে নিয়ে বিক্রি করা হতো দাস হিসেবে। দিল্লির ক্ষমতায় থাকা ষষ্ঠ মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনকালের শেষ দিকে বাংলা থেকে পাওয়া রাজস্বই ছিল সালতানাতের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু ব্যাপক লুটতরাজ আর সুশাসনের অভাব রাজস্ব আয়ে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম পুনর্দখল ও জলদস্যু দমনের দিকে মনোযোগ দেন সম্রাট। মূলত সপ্তদশ শতকের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম দখলের জন্য একের পর এক অভিযান চালায় মোগল বাহিনী; কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হতে হয়। এর মধ্যে ১৬১৪ সালে বাংলার মোগল সুবেদার কাসিম খান চিশতির এক ব্যর্থ অভিযানের কথা জানা যায়। তবে চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি এক দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

চট্টগ্রামের প্রাচীন মাণচিত্র

‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়া’

চট্টগ্রাম বিজয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিবরণী লিপিবদ্ধ আছে ‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়া’ নামের একটি বইয়ে। দুই খণ্ডের এই গ্রন্থের রচয়িতা ইবনে মুহম্মদ ওয়ালী। যিনি শিহাব উদ্দিন তালিশ নামে পরিচিত। শিহাব বাংলার সুবেদার মীরজুমলার (১৬৬০-১৬৬৩) মুনশি; অর্থাৎ কেরানি ছিলেন। মীরজুমলা পরিচালিত নানা অভিযানের বিবরণ লিপিবদ্ধ করাই তাঁর কাজ ছিল। সেসব বিবরণ নিয়েই মুহম্মদ ওয়ালী বা শিহাব উদ্দিনের দুই খণ্ডের ইতিহাস গ্রন্থ ‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়া। এর আরেক নাম ‘তারিখ-ই আসাম’। যেটির প্রথম পর্বে মীরজুমলার আসাম ও কামরূপ অভিযানের বিবরণ আছে। ১৬৬৩ সালে মীরজুমলার মৃত্যুর পরও শিহাব উদ্দিন তালিশ বাংলায় থেকে যান। ১৬৬৬ সালে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের ইতিহাসও তিনি লিপিবদ্ধ করেন। তবে ‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়ার’ সেই অংশ বহু বছর ধরে অপঠিত ছিল। বিশ শতকের প্রথম দশকে স্যার যদুনাথ সরকার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বোডলিয়ান লাইব্রেরিতে ‘ইবরিয়ার’ ওই অংশটি আবিষ্কার করেন। যদুনাথ সরকারের মতে, এই ঐতিহাসিক ঘটনার সবচেয়ে প্রামাণ্য বিবরণ ‘ফতহিয়া-ই ইবরিয়া’। সেই বইয়ে পাওয়া যায় মোগলদের চট্টগ্রাম অভিযানের নানা খুঁটিনাটি।

১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর মামা শায়েস্তা খাঁকে সুবেদার নিয়োগ করে বাংলায় পাঠান। শিহাব উদ্দিন তালিশের বিবরণ থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিজয়ের ভার দেওয়া হয়েছিল তাঁর ওপর। শায়েস্তা খাঁর অভিজ্ঞ দুই সেনা কর্মকর্তা মাহমুদ বেগ ও কাজী সামুর নেতৃত্বে নৌবাহিনী সাজানো হয়। নৌকা নির্মাণের কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় হকিম মহম্মদ হোসেন আর মহম্মদ মকিমকে। কিশোর দাসের তত্ত্বাবধানে নৌসেনাদের বেতন ও রসদের ব্যবস্থা করা হলো। অল্প সময়ের মধ্যে ৩০০ যুদ্ধপোত প্রস্তুত করা হয়, যা ছিল সেই সময়কার অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী।

অভিযানে পটভূমি

‘ফতহিয়া-ই ইবরিয়া’ অনুসারে, ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সুবেদার ছিলেন দিল্লির সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজা। এ সময়ে বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) প্রায়ই মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুর আক্রমণের শিকার হতো। অথচ রাজধানী রক্ষার জন্য মোগল সম্রাটের নির্দেশে ‘নওয়ারা’ নামের রণতরি এবং মাল্লা ও কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। এ জন্য বার্ষিক ১৪ লাখ টাকাও বরাদ্দ ছিল। স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর বইতে লেখেন, শাহ সুজার অদক্ষ শাসন এবং সরকারি আমলাদের দুর্নীতির কারণে নাওয়ায় নিয়োজিত সৈনিকেরা নিয়মিত বেতন পেতেন না। ১৬৫৮ সালে দিল্লির সিংহাসনকে কেন্দ্র করে শাহজাহানের চার পুত্র—দারা শিকোহ, শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বখশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। আওরঙ্গজেব এই দ্বন্দ্বে জয়ী হয়ে দিল্লির সিংহাসন দখল করলে শাহ সুজা পালিয়ে যান আরাকানে। পরে মীরজুমলাকে সুবেদার নিয়োগ দেন আওরঙ্গজেব। তিনি নতুন করে নৌবাহিনী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেন। তবে আসাম যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ১৬৬৩ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। সুযোগ পেয়ে ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে ঢাকা আক্রমণ করে চট্টগ্রামের মগ (আরাকানি) জলদস্যুরা। এ সময় বাংলার নৌশক্তি যা ছিল, তা–ও ধ্বংস হয় এই আক্রমণে।

সম্রাট আওরঙ্গজেব।

বাংলায় শায়েস্তা খাঁ

১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর মামা শায়েস্তা খাঁকে সুবেদার নিয়োগ করে বাংলায় পাঠান। শিহাব উদ্দিন তালিশের বিবরণ থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিজয়ের ভার দেওয়া হয়েছিল তাঁর ওপর। শায়েস্তা খাঁর অভিজ্ঞ দুই সেনা কর্মকর্তা মাহমুদ বেগ ও কাজী সামুর নেতৃত্বে নৌবাহিনী সাজানো হয়। নৌকা নির্মাণের কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় হকিম মহম্মদ হোসেন আর মহম্মদ মকিমকে। কিশোর দাসের তত্ত্বাবধানে নৌসেনাদের বেতন ও রসদের ব্যবস্থা করা হলো। অল্প সময়ের মধ্যে ৩০০ যুদ্ধপোত প্রস্তুত করা হয়, যা ছিল সেই সময়কার অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী।

নৌবাহিনী প্রস্তুতের পাশাপাশি শায়েস্তা খাঁ স্থাপন করলেন স্থল রক্ষার ব্যবস্থা। ঢাকা শহরের পাশেই সংগ্রামগড়ে দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন। সংগ্রামগড়ে নদী ও বন মিলিত হওয়ায় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। হুগলির সাবেক ফৌজদার মহম্মদ শরীফকে সেখানকার থানাদার নিয়োগ করা হলো। সঙ্গে সৈন্য ও তোপ স্থাপন করা হলো। যুদ্ধের রসদ ও সৈনিকদের যাতায়াতের জন্য একটি উঁচু ও দীর্ঘ আলবাঁধ নির্মাণ করা হয়; যা বর্ষার সময়ও সৈন্য ও অশ্বারোহীদের চলাচল নিশ্চিত করত।

বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ।

সন্দ্বীপ দখল

চট্টগ্রাম অভিযানের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সন্দ্বীপ। সে সময় সাবেক মোগল সেনা কর্মকর্তা দিলওয়ার খাঁ সন্দ্বীপ দখল করে সেখানে স্বাধীন রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রামের দখল নিতে সন্দ্বীপ জয় করা জরুরি ছিল। ১৯ নভেম্বর ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খাঁর নৌ সেনাপতি ইবনে হুসাইনের নেতৃত্বে সন্দ্বীপ দখল করে নেয় মোগলরা। এত দিন ধারণা ছিল, চট্টগ্রাম অজেয়। কিন্তু সন্দ্বীপ জয় করার পর চট্টগ্রাম দখল নেওয়ার বিষয়ে মোগল সেনারা অনেকটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল।

চট্টগ্রাম যুদ্ধে জেতার জন্য সব রকম কৌশলই অবলম্বন করেছিলেন শায়েস্তা খাঁ। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি পর্তুগিজ জলদস্যুদের নিজ দলে নিয়ে আসেন। সে সময় চট্টগ্রামে পর্তুগাল ও গোয়া থেকে আসা অনেক দলছুট সৈন্য আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের ওপর কোনো শাসকেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আয়ের একমাত্র পথ ছিল দস্যুতা। মগ রাজাকে দস্যুতা থেকে প্রাপ্য একটা অংশ দিয়ে চট্টগ্রামে জায়গা করে নিয়েছিল তারা। শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবেদার হওয়ার পর থেকেই পর্তুগিজদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়।

মোগলদের অভিনব কৌশল

চট্টগ্রাম যুদ্ধে জেতার জন্য সব রকম কৌশলই অবলম্বন করেছিলেন শায়েস্তা খাঁ। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি পর্তুগিজ জলদস্যুদের নিজ দলে নিয়ে আসেন। সে সময় চট্টগ্রামে পর্তুগাল ও গোয়া থেকে আসা অনেক দলছুট সৈন্য আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের ওপর কোনো শাসকেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আয়ের একমাত্র পথ ছিল দস্যুতা। মগ রাজাকে দস্যুতা থেকে প্রাপ্য একটা অংশ দিয়ে চট্টগ্রামে জায়গা করে নিয়েছিল তারা। শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবেদার হওয়ার পর থেকেই পর্তুগিজদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। তিনি তাদের মোগল সম্রাটের বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়ে ঢাকায় এসে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে পর্তুগিজরা দ্রুতই এই প্রস্তাব গ্রহণ করে ঢাকায় চলে আসে। পর্তুগিজদের একজন সেনাপতির নাম ছিল ক্যাপ্টেন মুর। সেই সময় তাঁর মাসিক বেতন ধরা হয় ৫০০ টাকা। সাহসী এই পর্তুগিজ সেনাপতি মগদের পক্ষ ত্যাগ করে মোগলদের অভিযানে যোগ দেন।

বাংলায় পর্তুগিজদের রণতরী।

চূড়ান্ত অভিযান ও বিজয়

চাটগাঁ অভিযানের প্রধান সেনাপতি হন নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান। তাঁর নেতৃত্বে চার হাজার অশ্বারোহী সেনা নিয়োগ দেওয়া হয়। ইখতিমাম খাঁ, সরান্দাজ খাঁ, ফহদি খাঁ, করাব্বল খাঁ, রাজপুত রাজা সুবল সিংহ শিশোদীয়, ইবন হোসেন ও মীর মর্তাজা নিযুক্ত হন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে।

নৌ ও স্থলপথে একই সঙ্গে শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি। তৈরি করা হয় যুদ্ধজাহাজ। সেখানে প্রশিক্ষিত তিরন্দাজ এবং কামানদার সেনা নিয়োগ দেওয়া হয়। মোগল সেনারা জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করে স্থলভাগ ধরে এগোতে থাকে। পাশাপাশি জলপথেও চলে যুদ্ধের আয়োজন। সন্দ্বীপ জয়ের পর আত্মবিশ্বাসী মোগল নৌবাহিনী চট্টগ্রাম অভিমুখে পৌঁছে যায়।

২৩ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম জলযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন ইবন হোসেন। যুদ্ধ শুরুর আগে মোগলরা কল্পনাও করেনি, এত সহজেই কর্ণফুলী নদীতে থাকা আরাকান রণতরিগুলো পিছু হটে যাবে। মোগলদের হঠাৎ আক্রমণের মুখে ভীষণ ভড়কে যায় আরাকানিরা। পূর্ণ নৌশক্তি ব্যবহার না করেই পালিয়ে যায় অনেকে। এমনকি স্বাধীন আরাকান রাজ্য থেকেও কোনো সহায়তা এসে পৌঁছায়নি। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগিজদের ওপর নির্ভরতার কারণে আরাকান সেনাদের মধ্যে মনোবলের অভাব দেখা দিয়েছিল। এ কারণে বড় বড় জাহাজ রেখেই পালিয়ে যায় তারা। চট্টগ্রামের নদীমুখে এভাবেই প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয় মোগলদের। ২৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধে মোগল নৌবাহিনী আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। চূড়ান্ত পতন তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। সমুদ্র ও নদীতে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর ১৬ জানুয়ারি আসে চূড়ান্ত বিজয়।

শিহাব উদ্দিন তালিশের লেখা তারিখ ই আসামের ইংরেজি অনুবাদ।

চট্টগ্রাম বিজয়ের তাৎপর্য

চট্টগ্রাম বিজয়ের মধ্য দিয়ে দুইভাবে লাভবান হয় দিল্লি। প্রথমত, এই অঞ্চলের জনসাধারণের জীবনে স্বস্তি–শান্তি আসে। দ্বিতীয়ত, জলদস্যুদের উৎপাত কমে যাওয়ায় কৃষি খাত ও বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়। রাজস্ব আদায়ও বহুগুণ বাড়ে। এই রাজস্বই ছিল বিশাল ভারতবর্ষের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল চালিকা শক্তি।

স্যার যদুনাথ সরকারের মতে, চাটগাঁ বিজয়ের ফলাফল ছিল বহুমাত্রিক। এটি কেবল সামরিক জয় নয়; বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থায়িত্বের প্রতীক। মগদের উপদ্রব বন্ধ হওয়ায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যে শান্তি ফিরে আসে। নদী ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং বাণিজ্য পুনরায় প্রসার লাভ করে। নবাবের নীতি অনুযায়ী প্রজাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়, যা স্থানীয় জনমতের সমর্থন অর্জনে সহায়ক হয়।