বলা হয়, বাংলা ১২১৭ সনে (১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) শাহ করিম বকস বাগদাদী এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সম্প্রতি বরিশাল নগরে
বলা হয়, বাংলা ১২১৭ সনে (১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) শাহ করিম বকস বাগদাদী এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সম্প্রতি বরিশাল নগরে

ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির স্মারক বরিশালের ২০০ বছরের পুরোনো ফকিরবাড়ি মসজিদ

বরিশাল নগরের ইতিহাস ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ফকিরবাড়ি মসজিদ। এটি দুই শতাব্দীরও বেশি আগে নির্মিত। নগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদটি বরিশালের অন্যতম প্রাচীন ইসলামি স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, অষ্টাদশ শতকে সুদূর বাগদাদ থেকে ধর্মসাধক হজরত শাহ করিম বকস বাগদাদী ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বরিশাল অঞ্চলে আসেন। পরে ১৮০৩ সালে রহমতপুরের জমিদার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর কাছ থেকে তিনি ৮ দশমিক ৫৭ একর নিষ্কর জমি পান। সে সময় নগরের পশ্চিম প্রান্তে ওই জমিতে বসতি স্থাপন করে স্থানীয় এলাকায় ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ‘ফকির সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন।

বাংলা ১২১৭ সালে (১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) শাহ করিম বকস বাগদাদী সেখানে একটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে এটি ‘ফকিরবাড়ি মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। ধারণা করা হয়, সে সময় মসজিদের সামনে প্রশস্ত আঙিনা ও প্রবেশদ্বার ছিল এবং পাশেই ছিল আরেকটি ভবন। পুরোনো ছবিতেও সেই স্থাপত্যরীতির উপস্থিতি দেখা যায়।

বর্তমানে বরিশাল নগরের সদর রোডের মধ্যবর্তী অংশ থেকে পশ্চিম দিকে সামান্য দূরে মসজিদটির অবস্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে মূল প্রবেশদ্বারের কিছু অংশ ভেঙে গেছে এবং প্রাচীন স্থাপত্যের কিছু বৈশিষ্ট্য আড়াল হয়ে পড়েছে।

তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির আয়তন দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট এবং  উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট

তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির পূর্ব দিকে দুটি প্রবেশপথ আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে একটি করে জানালা। মসজিদের আয়তন দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট ও উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট।

মসজিদের দক্ষিণ পাশে আছে ধর্মসাধক শাহ করিম বকস বাগদাদীর কবর। একই স্থানে তাঁর বাবা শাহ কুতুব উদ্দীন বাগদাদী এবং তাঁর সন্তান আবদুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ ও আবদুর রহিমসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের কবর। আবদুর রহমানের ছেলে শাহ আবদুল্লাহ এবং তাঁর ছেলে শাহ আবদুল নূর ও আবদুল কুদ্দুসের কবরও সেখানে আছে।

স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ফকিরবাড়ি মসজিদ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর বাংলা ১২১৯ সনে (১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ) জমিদার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী স্বপ্নাদেশ পেয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাষাণময়ী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে পাশাপাশি দুটি এলাকার নাম হয় ফকিরবাড়ি ও কালীবাড়ি। বরিশাল নগরে কালীবাড়ি ও ফকিরবাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও সম্প্রীতি এখনো বজায় আছে।

ফকির করিম বকসের প্রতিষ্ঠিত ফকিরবাড়ি মসজিদ এবং জমিদার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দিরের নাম অনুসারেই পরে ওই এলাকার দুটি সড়কের নাম রাখা হয় ‘কালীবাড়ি রোড’ ও ‘ফকিরবাড়ি রোড’।

ফকির শাহ করিম বকসের উত্তরাধিকারদের একজন শাহ সাঈদ নোমান। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক এই মসজিদ সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার জন্য মসজিদ সম্প্রসারণও করা হয়েছে। তবে মূল কাঠামো সংরক্ষণ করেই কাজটি করা হয়েছে। প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসে এখানে ইফতারের আয়োজন করা হয়, যেখানে কয়েক শ মানুষ অংশ নেন।