সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৮টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।
সিলেটে ‘অপরিপক্ব, অপরিচিত ও ভুল’ প্রার্থী বাছাই, বারবার প্রার্থী পরিবর্তন, চা-বাগানের ভোটকেন্দ্রগুলোতে এজেন্ট দিতে না পারাসহ কিছু কারণে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। দলের নেতারা বলছেন, তাঁরা এই পরাজয়ের কারণ খুঁজে দেখছেন। অন্যদিকে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় ভালো ফল এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৮টিতেই বিএনপির প্রার্থীরা জয় পান। কেবল সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ) আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসান জয় পেয়েছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামী সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে নির্বাচনী মাঠে নামে। অন্তত ৬টি আসনে তাঁদের প্রার্থীদের জয় পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। এ ছাড়া কয়েকটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়েরও আভাস ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের কোনো প্রার্থীই জয় পাননি।
সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টির মধ্যে ৮টি আসনই জোটের শরিকদের ছেড়ে দেয় জামায়াত। তিনটি আসন উন্মুক্ত। মোট ৮টি আসনে জামায়াতের দলীয় প্রার্থী ছিল। দলটির স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, জোটের শরিকদের ছেড়ে দেওয়া কিছু আসনে নিজেরা ভোট করলে জামায়াতের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা জানান, হবিগঞ্জ-১ আসনে সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী এবং সিলেট-৩ আসনে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদকে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জামায়াত দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর তাঁরা নির্বাচনী এলাকায় প্রচুর সময় দেন এবং নিজেদের পক্ষে মাঠ গুছিয়ে আনেন।
বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। মানুষজনও আগের সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ ছিল। বিএনপির ইশতেহারও মানুষজন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাই ভালো ফলাফল এসেছে।আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সভাপতি, সিলেট জেলা বিএনপি
তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে আকস্মিকভাবে জোটের শরিকদের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ায় শাহজাহান আলী ও লোকমান আহমদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। অথচ এ দুটি আসনে জামায়াতের জয় পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। অন্যদিকে হবিগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত দুই দফা তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত জোটের মনোনয়ন দেয় খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদেরকে। তবে নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেননি।
জামায়াতের একাধিক সমর্থক জানান, জোটের শরিকদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে একাধিক আসনে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ও নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত জোট। এমনকি শরিক দলকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে জামায়াত নিজেদের শক্তিশালী প্রার্থীদেরও মনোনয়ন দেয়নি। এটা সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল। শরিক দলের নতুন প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যথাযথ আস্থা অর্জন করতে পারেননি। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। এ ছাড়া চা-বাগানগুলোতে অবস্থিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনো এজেন্টই দিতে পারেনি ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাগানে কয়েক লাখ ভোট রয়েছে। অথচ সেখানকার কেন্দ্রগুলোতে আমাদের কোনো এজেন্ট ছিল না। এসব ভোটও আমরা পাইনি বলা চলে। এ ছাড়া বিএনপির কর্মী, সমর্থকেরা নির্বাচনের আগের রাতে ব্যাপকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন, টাকাও বিলিয়েছেন। এসব কারণেই আমাদের প্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জয় পাননি।
জামায়াতের এক নেতা জানান, জামায়াত যেসব আসনে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে, এর মধ্যে সুনামগঞ্জের একটি আসনে প্রার্থী বাছাইয়েও ভুল ছিল। শেষ মুহূর্তে এসে একের পর প্রার্থী পরিবর্তন করে শরিক দলকে আসন ছেড়ে দেওয়া, সমঝোতায় আসতে না পেরে তিনটি আসন উন্মুক্ত রাখা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট ব্যাপকভাবে টানতে না পারায় প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। এর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে ভোট কিনতে প্রচুর টাকাও বিলিয়েছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের ওই নেতা।
অবশ্য সিলেট বিভাগে জামায়াতে ইসলামী অতীতেও খুব বেশি ভালো করেনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৫ আসনে ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বলার মতো অর্জন নেই দলটির।
নির্বাচন-পরবর্তী জামায়াতের ফলাফল বিশ্লেষণের বিষয়ে জানতে দলটির সিলেট মহানগরের আমির ও সিলেট বিভাগের মধ্যে একমাত্র কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি সাড়া না দেওয়ায় বক্তব্য জানা যায়নি। তবে জামায়াতের এক নেতা জানান, তাঁরা পরাজয়ের কারণগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলার সব কটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের নির্বাচনী কাজের সমন্বয়ক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। মানুষজনও আগের সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ ছিল। বিএনপির ইশতেহারও মানুষজন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাই ভালো ফলাফল এসেছে।
জামায়াতের অভিযোগ প্রসঙ্গে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী আরও বলেন, জামায়াতই আগের রাতে প্রভাব বিস্তার, টাকা বিলিয়ে ভোট কেনাসহ নানা অপকর্ম করেছে। এসব নিয়ে বিএনপি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তাৎক্ষণিক অভিযোগও করেছে। এখন জামায়াত উল্টো মিথ্যাচার চালিয়ে বিএনপিকে দোষারোপ করছে। তবে তাদের সব অপকর্মের জবাব ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমেই দিয়েছেন।