
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছেন তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তাঁদের প্রতি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো আলাদা করে সমর্থন দিয়েছিল। তবে ভোটের মাঠে এর প্রভাব পড়েছে কম।
খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৫১ হাজার ৪০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩১৫ ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান ৮২ হাজার ৭২৫। এ আসনে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯১০ ভোট। তিনি চতুর্থ হয়েছেন। তৃতীয় হওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. এয়াকুব আলী ভোট পেয়েছেন ৫৮ হাজার ৫৪৫।
সমতলের তুলনায় পাহাড়ে ভোটের রাজনীতি ভিন্ন। এখানে আঞ্চলিক দলের প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাবের কারণে অধিকাংশ সময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভোট সচরাচর নির্দিষ্ট একটি পক্ষের দিকে যায়। তবে এবার তা বিভক্ত হয়ে গেছে। কেননা ইউপিডিএফ ও জেএসএস আলাদা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে।
এ আসনের দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ধর্ম জ্যোতি চাকমাকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সরাসরি এবং সমীরণ দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে।
এদিকে রাঙামাটি আসনে বিএনপির দীপেন দেওয়ান পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট। এ আসনের একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পেয়েছেন ৩১ হাজার ১৪২ ভোট। পহেল চাকমাকে ইউপিডিএফ সমর্থন দিয়েছিল। দুই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, নানা ষড়যন্ত্র ও হুমকির কারণে অনেক এলাকায় স্বাভাবিক প্রচার চালাতে পারেননি। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে ফল ভিন্ন হতে পারত বলে দাবি করেন তাঁরা।
বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনেই জয়লাভ করেছে। এবারই প্রথম একসঙ্গে পাহাড়ের তিন আসন পেল দলটি। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে জিতেছিল বিএনপি।
খাগড়াছড়ি আসনে ১১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় দুই স্বতন্ত্রের। মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাইরে এই আসনে দুজন নারীও নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিলেন। তবে ভোটে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি তাঁরা। তাঁদের মধ্যে জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা পেয়েছেন ১ হাজার ২৪ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জিরুনা ত্রিপুরা পেয়েছেন ৯০৪ ভোট। প্রচারে মিথিলা রোয়াজাকে সক্রিয় দেখা গেলেও জিরুনা ত্রিপুরার উপস্থিতি ছিল না।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সমতলের তুলনায় পাহাড়ে ভোটের রাজনীতি ভিন্ন। এখানে আঞ্চলিক দলের প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাবের কারণে অধিকাংশ সময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভোট সচরাচর নির্দিষ্ট একটি পক্ষের দিকে যায়। তবে এবার তা বিভক্ত হয়ে গেছে। কেননা ইউপিডিএফ ও জেএসএস আলাদা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে। তবে খাগড়াছড়ি আসনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য নাগরিক সমাজ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরে সমঝোতা ভেস্তে যায়।
সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা ফলাফল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় কারচুপির অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নানা ষড়যন্ত্র ও হুমকির কারণে অনেক এলাকায় তাঁরা স্বাভাবিক প্রচারণা চালাতে পারেননি। সীমিত পরিসরে প্রচারণা করতে হয়েছে। সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে ফল ভিন্ন হতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ছাত্র, যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষের বিপুল সমর্থন পেয়েছেন।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী মিথিলা রোয়াজাও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। কোথাও কোথাও কারচুপির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করলেও ফল মেনে নিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সমীরণ দেওয়ান। তবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাঙামাটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন জেএসএস সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের সাবেক নেতা পহেল চাকমা। তবে নির্বাচনে যাতে প্রার্থী না হন, সে জন্য জেএসএসের বাধা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁকে ইউপিডিএফ সমর্থন দেয়। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ানের কাছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৭০২ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান পহেল চাকমা। তবে ফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
পহেল চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, অনেক কেন্দ্রে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। সেখানে ৫৪ শতাংশ দেখিয়েছে। কিছু কিছু কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রতীকে আগে থেকে সিল মারা ছিল। আবার যেসব কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারেননি, সেখানে তাঁর ভোট শূন্য দেখানো হয়েছে, যা অসম্ভব। এ ছাড়া প্রচারেও তাঁকে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভোটের দিন মুঠোফোনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রশাসনকে জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।
এ আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও একমাত্র নারী প্রার্থী ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির জুঁই চাকমা। তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ৭০ ভোট। তিনি বলেন, অনেক ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট না দিতে বলা হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে শূন্য ভোট দেখানো হয়েছে। তবে কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি তিনি।
প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ভালো বলতে পারবে। তবে নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য প্রদানের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিশাত শারমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।