চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে মারা যাওয়া রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির কনিকা মণ্ডলের বাড়িতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শুক্রবার সকালে
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে মারা যাওয়া রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির কনিকা মণ্ডলের বাড়িতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শুক্রবার সকালে

‘পেটে গজ রেখেই সেলাই’—রাজবাড়ীর সেই কনিকার বাড়িতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে মারা যাওয়া রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার কনিকা মণ্ডলের (৩৫) পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তদন্তে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কনিকার পরিবারকে ৫০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন মন্ত্রী।

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ায় প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বুধবার দিবাগত রাতে কনিকা মারা যান বলে অভিযোগ পরিবারের। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে কনিকাদের বাড়িতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সান্ত্বনা দেন।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে চিকিৎসকদের বরখাস্তসহ ক্লিনিকগুলোকে জরিমানা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনেরাও তৎপর আছেন। যেসব ক্লিনিকে লেবার রুম নেই, লাইসেন্স ও পরিবেশ সার্টিফিকেট নেই, সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে। গত ১৭ বছরে ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতালের সামনে ক্লিনিক গজে উঠেছে। এক-দুই মাসে এগুলো সমাধান সম্ভব নয়। যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে, বন্ধসহ লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসায় অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। কেউ জড়িত থাকলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অবহেলার কারণে একজন মায়ের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাতেই আমি এখানে এসেছি। সরকার এই পরিবারের পাশে থাকবে।’

এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, সিভিল সার্জন এস এম মাসুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সামসুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ উল হাসান, বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ফারুক হোসেন, বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রব তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম শওকত সিরাজ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরওয়ার ভূইয়াসহ দলীয় নেতা–কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

কনিকার পরিবার জানায়, গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্তের মাধ্যমে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন কনিকা মণ্ডল। পরদিন তাঁর পেট ফুলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ফরিদপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে তাঁরা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। ৩ জুলাই তাঁকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৭ জুলাই কনিকার পেটে গজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত হলে ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে গজ বের করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে কনিকা মারা যান।

কনিকার স্বামী অশান্ত মণ্ডল বলেন, ‘চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী চলে যাওয়ায় আমাদের সংসারটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন তিন সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

তদন্ত কমিটি গঠন

অস্ত্রোপচারের পর প্রসূতির পেটে গজ কাপড় রেখে সেলাইয়ের ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান গত বৃহস্পতিবার রাতে এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তাঁদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মোক্তার হোসেন খানকে। সদস্যসচিব হিসেবে আছেন ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতানা বেগম। কমিটির অপর তিন সদস্য হলেন ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার সঞ্জীপন গাইন, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা জ্যোতিময় জ্যোতি ও নুপুর পাল।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ দেখে তিনি এ তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বেসরকারি ওই হাসপাতাল ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।