
বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, দূরের পুকুর থেকে পানি বয়ে আনা কিংবা অনিরাপদ পানি ফুটিয়ে খাওয়াই ছিল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বহু পরিবারের বাস্তবতা। বছরের পর বছর চলে আসা সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে নতুন এক উদ্যোগে। নদী ও খালের পানি পরিশোধন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই উদ্যোগ শুধু বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতাই বাড়ায়নি, পানিবাহিত রোগ কমিয়ে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হয়ে উঠছে।
বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী উপজেলা পাথরঘাটার ভূপ্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে গভীর নলকূপেও লবণাক্ত পানি ওঠে। চারপাশ নদী ও সাগরে ঘেরা হলেও সেই পানি পানযোগ্য নয়, তীব্র লবণাক্ত। ফলে সারা বছর স্থানীয় মানুষকে সরকারি খাসপুকুর কিংবা সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। যা শুধু দৈনন্দিন কষ্ট নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্যসংকটও তৈরি করেছে।
এ বাস্তবতার মধ্যেই কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহের ব্যবস্থা স্থানীয় মানুষের কাছে সুপেয় পানির নতুন এক ঠিকানা হয়ে উঠেছে। যেখান থেকে সুপেয় পানি পাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার।
নিরাপদ পানির নতুন মডেল
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে অক্সফাম ও এমটিবি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনএসএস (নজরুল স্মৃতি সংসদ) পাথরঘাটায় ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন ও সরবরাহের ব্যবস্থা চালু করে। এ প্রকল্পের আওতায় নদী ও খালের পানি পরিশোধন করে আড়াই হাজার পরিবারের প্রায় আট হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় পৃথক এলাকায় দুটি বড় ও ছয়টি ছোট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কাজ করছে। প্রতিটি পরিবার দৈনিক প্রয়োজন অনুযায়ী, ৫ থেকে ১০ লিটার পানি সংগ্রহ করে। প্রতি লিটার পানি ৩০ পয়সা মূল্যে কিনে নিচ্ছেন উপকারভোগীরা, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সহজলভ্য।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আকারের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনে সাড়ে আট লাখ টাকার মতো খরচ পড়ে। ছোটটির ক্ষেত্রে সেটি দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বড় প্ল্যান্টে ঘণ্টায় দেড় হাজার লিটার ও ছোট প্ল্যান্টে ৫০ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা যায়। বর্তমানে প্ল্যান্টগুলো সকালে দুই ঘণ্টা ও বিকেলে দুই ঘণ্টা চালানো হয়।
পানি বিক্রির টাকা সরাসরি ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ আবার সুবিধাভোগী পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
নারীরাই ব্যবস্থাপনায়
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পানযোগ্য পানির দিক থেকে দেশের সবচেয়ে সংকটাপন্ন এলাকাগুলোর অন্যতম পাথরঘাটা। এখানে সুপেয় পানির সংস্থান করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারীরা। তাঁদের প্রতিদিনের সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয় পানি সংগ্রহে। অনেক ক্ষেত্রেই খাসপুকুরের সীমিত সংখ্যার কারণে দীর্ঘ পথ হেঁটে পানি আনতে হয়।
কমিউনিটিভিত্তিক প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিচালনায় থাকেন নারীরাই। পানি উৎপাদন থেকে শুরু করে পানি বিতরণ, হিসাবরক্ষণ ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন সুবিধাভোগী নারীরা।
পাথরঘাটার বলেশ্বর নদ তীরবর্তী গাববাড়িয়া সরকারি আবাসনসহ আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করেন। আগে যেখানে দূর থেকে পানি আনতে হতো বা পুকুরের পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করতে হতো, এখন একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকেই নিরাপদ পানি পাওয়া যাচ্ছে। শুধু গাববাড়িয়া নয়, চরদুয়ানি, তাফালবাড়িয়া, খলিফার হাট, মধ্য জ্ঞানপাড়া, দশঘর, হোগলাপাশাসহ সাতটি গ্রামের মানুষ এখন এ নিরাপদ পানি পানের সুবিধা পাচ্ছেন।
গাববাড়িয়া আবাসনে পানি শোধনাগারটি পরিচালনা করেন এখানকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম। তিনি বলেন, গাববাড়িয়া আবাসনের ৫০টি পরিবার এই শোধনাগার থেকে প্রতিদিন পানি নেয়। এ ছাড়া আরও ছয়টি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের জন্য প্রতিদিন দুবার করে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি পরিবারের তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
কমেছে রোগবালাই, দূর হয়েছে কষ্ট
খলিফার হাট এলাকার ফাতেমা বেগম (৩৮), তাজেনুর বেগম (৪৫) ও হনুফা বেগম (৪২) এখন বাড়ির পাশের শোধনাগার থেকে নিয়মিত পানি নেন। তাঁরা বলেন, আগে শুকনা মৌসুমে পুকুরের পানি নোংরা ও লবণাক্ত হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করতে হতো। ২০২৪ সালে এই শোধনাগার চালুর পর সেই পরিস্থিতি বদলেছে। তাঁদের ভাষায়, এখন আর শিশুদের নিয়ে বারবার হাসপাতালে যেতে হয় না। ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ অনেকটাই কমে এসেছে।
গাববাড়িয়া আবাসনের বাসিন্দা সাহেদা বেগম (৬০) বলেন, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। দূর থেকে পানি আনার মতো শক্তি তাঁর নেই। আগে খাল, নদী ও পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করতেন। এতে তাঁদের অসুখ লেগেই থাকত। এখন এ আবাসনেই নিরাপদ পানি পাওয়া যায়। এখন আর কারও কোনো অসুখ নেই।
শারমিন আক্তার নামের আরেক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পানির যে কী কষ্ট, আলহে মোগো বুঝাইতে পারমু না। আগে আধা কিলোমিটার দূরের পুহুইরে (পুকুর) গোনে খাবার পানি আনা লাগত। হেই পানিও নিরাপদ আলহে না, বাচ্চাগুলার প্রায়ই ডায়রিয়া অইত। এহন আবাসনে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা অওনে মোগো কী যে আছান অইছে, বুঝাইতে পারমু না।’
এনএসএসের ওয়াশ ফ্যাসিলিটেটর ঝরনা আক্তার বলেন, এনএসএস সবচেয়ে পানিসংকটপ্রবণ এলাকায় জরিপ করে এই প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এখানকার বাসিন্দাদের রোগবালাই অনেক কমেছে এবং মানুষ সহজে নিরাপদ পানি পাচ্ছেন।
পানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপদ পানি এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য। এ বাস্তবতায় পাথরঘাটায় নেওয়া ওই উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এটি উপকূলীয় পানিসংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর উদ্যোগ বলে মনে করেন এনএসএসের নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমছে উল্লেখ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে উন্নীত না হলে প্ল্যান্টগুলো সুবিধাভোগী নারীদের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবস্থাপনা কমিটি প্ল্যান্টগুলো চালানোর সক্ষমতাও অর্জন করেছে। ইতিমধ্যে সুবিধাভোগী নারীদের কারিগরি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের ত্রুটি হলে দ্রুত টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষা কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সদস্য রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, পাথরঘাটার এই অভিজ্ঞতা এখন একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে—জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির টেকসই সমাধান কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ প্রকল্প সেই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর হিসেবে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং নারীনেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করছে।
এম জসীম উদ্দীন, পাথরঘাটা, বরগুনা থেকে ফিরে