সকাল থেকেই নওগাঁ সদর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে। পরিচিত মুখ দেখলেই কেউ ছুটে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরছিল, কেউ হাত মেলাচ্ছিল। কেউ আবার মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখছিল দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ার মুহূর্ত। বন্ধুদের কেউ কেউ বলছিল, ‘কী রে, কেমন আছিস?’
একই বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া যমজ দুই বোন শুভমিতা রায় ও সমাদ্রিতা রায়ও এসেছিল অনুষ্ঠানে। শুভমিতা বলে, ‘আমাদের সাফল্য উদ্যাপন করতে এত বড় আয়োজন। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। অনেক বান্ধবীর সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হলো। ওদের সঙ্গে আড্ডা হবে, আনন্দ হবে। অনেক মজা করব।’
নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা’। নওগাঁ বন্ধুসভার সদস্য পারমিতা রায়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নওগাঁ প্রতিনিধি ওমর ফারুক। অভিভাবকদের মধ্যে বক্তব্য দেন দেওয়ান মাহবুব আলম ও মিনা আক্তার।
প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে দিনমজুর বাবার সঙ্গে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিল সাফিয়া খাতুন। সে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালা থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসার অনুভূতি প্রকাশ করে সাফিয়া বলে, ‘আজকের এই সংবর্ধনা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মায়ের। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাঁরা পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছেন। শিক্ষকেরাও অনেক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাকে এই ফল করতে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।’
নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া নওশিন বিনতে রউফ বলে, ‘এখানে এসে অনেক দিন পর আমার বান্ধবীর দেখা পেলাম। পরীক্ষার পরপরই অনেকেই রাজশাহী ও ঢাকায় চলে গিয়েছে। এই অনুষ্ঠানে তাদের অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে জানব, কার কলেজ কেমন, কে কীভাবে পড়াশোনা করছে।’
অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে নওগাঁর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আইনজীবী ডি এম আব্দুল বারী বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। আবৃত্তি, গান, খেলাধুলাসহ শিক্ষার্থীদের অন্যান্য আগ্রহ ও সৃজনশীলতার চর্চা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের আইটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আব্দুল বারী বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে। এটি আইটি ও এআইয়ের যুগ। তোমাদের প্রযুক্তির সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে। নিজেদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু চাকরি, অর্থ উপার্জন ও গতানুগতিক জীবনযাপনের পেছনে না ছুটে সমাজ, সভ্যতা ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তোমাদের নিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সাটিয়ার এবং নওগাঁ কৃষ্ণধন (কেডি) সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক হাসমত আলী।
প্রথম আলো রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তোমরা আজকে ভালো ফল করেছ। ভবিষ্যতে দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকো না কেন, তিন ‘মা’কে কখনো ভুলবে না। একটা হলো নিজের জন্মদাত্রী মা, আর দুইটা হলো নিজের জন্মভূমি মা ও মাতৃভাষা মা।’ ভালো কিছু করতে হলে মাদক থেকে দূরে থাকা, মিথ্যা না বলা এবং না বুঝে কোনো কিছু মুখস্থ না করার পরামর্শ দেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যাকে ‘না’ বলার শপথ পাঠ করানো হয়। শপথ পাঠ করান প্রথম আলো নওগাঁ বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও রাণীনগর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক বেলায়েত হোসেন।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা তখনো শেষ হয়নি। ক্রেস্ট হাতে বাড়ি ফেরার আগে কেউ বন্ধুদের সঙ্গে শেষবারের মতো ছবি তুলছিল, কেউ ফোন নম্বর বিনিময় করছিল। সাফল্যের আনন্দ, দীর্ঘদিন পর বন্ধুদের দেখা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন—সব মিলিয়ে দিনটি শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নওগাঁয় আজকের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের আয়োজন পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।