দুর্গম পাহাড় আর বন বেষ্টিত বড়থলি ইউনিয়নের প্রংজাং পাড়া
দুর্গম পাহাড় আর বন বেষ্টিত বড়থলি ইউনিয়নের প্রংজাং পাড়া

মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক, চিকিৎসাকেন্দ্র, মাধ্যমিক বিদ্যালয়—কিছুই নেই, ইউপি কার্যালয়ও আরেক জেলায়

ইউনিয়নটির একপাশে ভারতের মিজোরাম, আরেক পাশে মিয়ানমারের চিন রাজ্য। পুরোটাই দুর্গম পাহাড় আর বন দিয়ে বেষ্টিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক কিছুই পাওয়া যায় না। অথচ বসবাস করেন ২৪টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নের চিত্র এটি। এর অবস্থান রাইখ্যং হ্রদের তীরে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট উঁচুর এ হ্রদটি প্রায় এক মাইল দীর্ঘ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এ হ্রদের কারণেই বড়থলির মানুষ যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। সেখানে কোনো স্থায়ী বাজারও নেই। নাগরিক কোনো সেবা পেতে হলে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যেতে হয়।

আমাদের অনেক বাচ্চা পড়তে চায়। কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনা আর নদীর পানি বাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওদের পড়াশোনা বন্ধ থাকে।
মতি ত্রিপুরা, কারবারি, বড়থলির পলথনপাড়া।

২৭৮ বর্গকিলোমিটারের এই ইউনিয়নে যেতে হয় উঁচু-নিচু পাহাড় ডিঙিয়ে। মূলত হেঁটেই এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা চলাচল করেন। ২০১৩ সালে ফারুয়া ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ড নিয়ে ইউনিয়নটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ জনশুমারির (২০২২) হিসেবে সেখানে ৩ হাজার ৫৯৫ মানুষের বসবাস। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ইউপির অস্থায়ী কার্যালয় বান্দরবানের রুমায়।

ইউনিয়নটিতে তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমী ও ম্রো—এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস করেন। পাহাড়ে জুমচাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁরা। বাসিন্দারা খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। ১০টি গির্জা ও দুটি বৌদ্ধবিহার রয়েছে।

বড়থলি ইউনিয়নের পুকুর পাড়া

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পড়ালেখা

পুরো ইউনিয়নে ৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। এ কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিকের পরেই ঝরে পড়ে। কেউ কেউ হ্রদ পেরিয়ে অন্য ইউনিয়নের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বর্ষা মৌসুমে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে না। এ মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ থাকে।

বড়থলির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পলথন পাড়ার কারবারি মতি ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের অনেক বাচ্চা পড়তে চায়। কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনা আর নদীর পানি বাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পড়াশোনা বন্ধ থাকে।’

মতি ত্রিপুরা বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউনিয়নে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হলেও বাসিন্দারা উপকৃত হতেন।’

বড়থলি ইউনিয়ন থেকে রাঙামাটি জেলা সদর যাওয়ার চেয়ে বান্দরবানে রুমা উপজেলা যাওয়া তুলনামূলক সহজ। ওই ইউনিয়ন থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে যেতে বাসিন্দাদের সময় লাগে প্রায় দুই দিন। আর বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যেতে সময় লাগে এক দিন। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে বাসিন্দাদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার হাঁটতে হয়।

সেবা পেতে হাঁটতে হয় ২৭ কিলোমিটার

বড়থলি ইউনিয়ন থেকে রাঙামাটি জেলা সদর যাওয়ার চেয়ে বান্দরবানে রুমা উপজেলা যাওয়া তুলনামূলক সহজ। ওই ইউনিয়ন থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে যেতে বাসিন্দাদের সময় লাগে প্রায় দুই দিন। আর বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যেতে সময় লাগে এক দিন। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে প্রায় ২৭ কিলোমিটার হাঁটতে হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ও ১২৪ নম্বর নাড়াইছড়ি মৌজার হেডম্যান শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, ‘বড়থলি ইউনিয়নটি অত্যন্ত দুর্গম। বিলাইছড়ি সদরে আসতে আড়াই থেকে তিন দিন লাগে। ন্যূনতম নাগরিক সেবা পেতেই মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

বড়থলি ইউনিয়নের সুরোহা পাড়া

বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউনিয়নে ২ হাজার ১০০ ভোটার এবং প্রায় ৫ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসাকেন্দ্রে সুব্যবস্থা নেই। ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ও আরেক জেলায়, ২৭ কিলোমিটার দূরে। সেবা নিতে বা দিতে ২৭ কিলোমিটার হাঁটতে হয়, বাজারে কেনাকাটা করতে যাতায়াতেই চলে যায় দুই দিন।’

জানতে চাইলে বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এলাকাটি খুবই দুর্গম। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল, তবে দুর্গমতা ও শিক্ষার্থী–সংকট থাকায় আপাতত এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।’