প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে কম্বল পেয়ে খুশি এক নারী। আজ রোববার খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রায়েরমহল হামিদনগর হাজী মো. মুহসীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে
প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে কম্বল পেয়ে খুশি এক নারী। আজ রোববার খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রায়েরমহল হামিদনগর হাজী মো. মুহসীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে

প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগ

‘কম্বলডা পাইয়ে ভালো হইল, এট্টু ওম পাওয়া যাবে’

রোকেয়া বেগমের স্বামী মারা গেছেন অনেক বছর আগে। তখন তাঁর দুই মেয়েই ছোট ছিল। সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী হামিদনগরে ৭০০ টাকা ভাড়ার এক কক্ষের বাসায় এখন একাই থাকেন তিনি। প্রতিদিন আশপাশের বিল ও খেত থেকে শাকপাতা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। সেই আয়ে সংসার চলে।

আজ রোববার প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে শীতের কম্বল পেয়ে খুশি রোকেয়া বেগম। গায়ে জড়িয়ে বলেন, ‘আমাগে খোঁজ কেউ নিতি চায় না। আলাদা করে কম্বল কেনার সামর্থ্য আমার নেই। কম্বলডা পাইয়ে খুব ভালো হইল, গায়ের ওপর দিলি এট্টু ওম পাওয়া যাবে।’

আজ ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নের হামিদনগরে শতাধিক অসহায়, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে কম্বল দেওয়া হয়েছে। রায়েরমহল হামিদনগর হাজী মো. মুহসীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে খালেকনগর, মোস্তর মোড়, হামিদনগর, রায়েরমহল ও জেলেপাড়া এলাকার শীতার্ত নারী–পুরুষ অংশ নেন। সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে এই শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন প্রথম আলোর খুলনা বন্ধুসভার সদস্যরা।

এর আগে গতকাল শনিবার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে শীতার্ত মানুষের তালিকা প্রস্তুত করেন বন্ধুসভার সদস্যরা। চলতি শীতে যাঁরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাজী মো. মুহসীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হন উপকারভোগীরা। বৃদ্ধ, বৃদ্ধাসহ কোলের শিশু নিয়েও এসেছিলেন অনেকে। নারী ও পুরুষকে আলাদা লাইনে দাঁড় করিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে কম্বল বিতরণ করা হয়।

দুই বছরের সন্তান তাবাবসুমকে কোলে নিয়ে কম্বল নিতে এসেছিলেন সাজেদা বেগম। তাঁর আদি বাড়ি সাতক্ষীরার দুর্যোগপ্রবণ আশাশুনি উপজেলার চেউটিয়া গ্রামে। কাজের সন্ধানে ৯ বছর আগে তিনি হামিদনগরে আসেন। স্বামী দিনমজুর। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কম্বল হাতে পেয়ে সাজেদা বলেন, ‘এই প্রথম কেউ একটা কম্বল দিল। অনেক ভালো লাগছে। আমার ছোট দুটি বাচ্চা, এটা ব্যবহার করতে পারবে।’

রায়েরমহল জেলেপাড়ার চারু বিশ্বাসের জীবনেও কষ্টের শেষ নেই। স্বামী নেই, দুই বছর আগে মারা গেছেন একমাত্র ছেলে। ছেলের বউ বাবার বাড়িতে চলে যাওয়ার পর একাই থাকেন। কম্বল নিয়ে ফেরার পথে কথা বলতে গিয়ে চোখের কোণে পানি জমে ওঠে চারু বিশ্বাসের। কাপড়ের আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘শাকপাতা তুলি, বেচি খাই। আমাগো কাছে কিছু আসে নে। কেউ না দিলি কোয়ানে পাব। এই প্রথম আপনাগো কাছে কম্বল পালাম। শীতির সময় গায়ের পরে দিলি গরম হবে, ভালো ঘুম পড়া যাবে।’

কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে হাজী মো. মুহসীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম, বিএনপির স্থানীয় ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সোহরাব মোল্লা, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসের কর্মী তনুশ্রী রায়, প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল, সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেন, প্রথম আলোর খুলনা বন্ধুসভার অর্থ সম্পাদক অনির্বান সরকার, প্রচার সম্পাদক ফারজানা আক্তার, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক মো. হাসিবুর রহমান, ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য সম্পাদক দ্বীপ মণ্ডলসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

পরে সেখান থেকে বন্ধুসভার প্রতিনিধিদল খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার ৪৮ রিকশাচালক ও ছিন্নমূল মানুষের হাতে প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল তুলে দেয়। অন্য একটি দল সুন্দরবন–সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের দুর্যোগকবলিত সুতারখালী গ্রামের শীতার্ত ৫০ মানুষের হাতে কম্বল বিতরণ করে।

কম্বল পেয়ে সুতারখালীর সত্তরোর্ধ্ব ফুলমতি বৈষ্ণব বলেন, ‘আমাগো এদিক সিডর, আইলা, আম্পান—বড় বড় ঝড় লাগেই থাকে। মানুষির কাছে সেরাম কিছু আসে না। যারা দৌড়োতি পারে, তারা কিছু পায়। আমাগো কপালে জোটে না। তোমাগো কম্বল পাইয়ে ভালো হুয়েছে।’

শীতার্তদের সহায়তায় আপনিও এগিয়ে আসুন:

শীতার্ত মানুষের সহযোগিতায় আপনিও এগিয়ে আসতে পারেন। সহায়তা পাঠানো যাবে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে। হিসাবের নাম: প্রথম আলো ট্রাস্ট/ত্রাণ তহবিল, হিসাব নম্বর: ২০৭ ২০০০০ ১১১৯৪, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, কারওয়ান বাজার শাখা, ঢাকা। পাশাপাশি বিকাশে সহায়তার অর্থ পাঠাতে পারেন: ০১৭১৩০৬৭৫৭৬ এই মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বরে। এ ছাড়া বিকাশ অ্যাপে ডোনেশন অপশনের মাধ্যমেও অনুদান পাঠাতে পারেন।