রাজশাহী নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গুল গফুর পেট্রোলিয়ামের সামনে এমন ভিড়। প্রত্যেক মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা তেল দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে বারোটায়
রাজশাহী নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গুল গফুর পেট্রোলিয়ামের সামনে এমন ভিড়। প্রত্যেক মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা তেল দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে বারোটায়

রাজশাহীতে পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ কম, গাড়ির ভিড়

রাজশাহী নগরের সাগরপাড়ার মেসার্স আফরীন পেট্রলপাম্পের তেল শেষ হয়ে গেছে গত শুক্রবার সন্ধ্যায়। টানা তিন দিন পর আজ মঙ্গলবার বিকেলে এক গাড়ি তেল পাওয়ার কথা রয়েছে। পাম্পের সামনে দড়ি টানিয়ে রাখা হয়েছে। দড়ির সঙ্গে নোটিশ ঝোলানো। তাতে লেখা, ‘পেট্রল নাই, অকটেন নাই’। খালি পাম্প পাহারায় বসে রয়েছেন তিন পুলিশ সদস্য।

আফরীন পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক সোলায়মান কবির আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদরাত সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে তেল নেই। মাঝখানে দুই দিন ডিপো বন্ধ ছিল। আজ বিকেলে ৯ হাজার লিটারের এক গাড়ি পেট্রল আসার কথা। এখন দড়ি টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। লিখে দেওয়া হয়েছে, তেল নেই, তবু মানুষ এসে ভিড় করছেন। তাঁদের জবাব দিতে হচ্ছে। কী হয় না হয়, সে জন্য পুলিশ পাহারায় রয়েছে।

কোনো কোনো পাম্প তেল পেলেও চাহিদার পুরোটা পায়নি। এসব পাম্পে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার পেট্রল দেওয়া হচ্ছে। তেল নিতে পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছে। এমন দৃশ্য রাজশাহীর বেশ কয়েকটি তেলের পাম্পে।

রাজশাহী নগরের প্রাণকেন্দ্র কুমারপাড়ায় অবস্থিত গুলগফুর পেট্রোলিয়ামে ৩০০ টাকা পর্যন্ত তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেল নিতে গাড়ির সারি রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে। রাস্তার ভিড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাস্তার যানজট সামলাতে দেখা যায়। কয়েকজন জানালেন, এই অবস্থা চলছে ঈদের আগে থেকেই।

রাজশাহী পদ্মা অয়েল কোম্পানির উপব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, তাঁদের একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, গত বছর মার্চ মাসে যেমন চাহিদা ছিল, সেই অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী জেলার পদ্মা অয়েলের কয়েকটি পাম্পের জন্য আজ ১৮ হাজার লিটার করে পেট্রল ও অকটেন দেওয়া হয়েছে। আর রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই ছয় জেলার জন্য মঙ্গলবারের বরাদ্দ ৪৫ হাজার লিটার অকটেন, ৬৭ হাজার লিটার পেট্রল ও ৩ লাখ ৩৭ হাজার লিটার ডিজেল। তিনি বলেন, তেলের সংকট হওয়ার কথা নয়। মানুষ হয়তো আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছে। এতে করেই তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ মজুত করছেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

রাজশাহী নগরের মেসার্স আফরিন ফিল্ম স্টেশনে টানা তিনদিন ধরে তেল পাচ্ছে না। মঙ্গলবার বেলা বারোটায় নগরের সাগর পাড়া এলাকায়

রিমন আলী নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি নগরের পবা এলাকার একটি পাম্প থেকে গতকাল সোমবার দিবাগত রাত চারটার দিকে তেল নিতে পেরেছেন। তখন ফাঁকা ছিল, তিনি ট্যাংক ভরে নিতে পেরেছেন। ফারুক হোসেন নামে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ঈদের আগে তিনি তেল নিয়েছিলেন। পরে আর কোথাও তেল নেওয়ার সুযোগ পাননি।
একই অবস্থা চলছে নাটোরের লালপুর উপজেলায়। উপজেলার মধুবাড়ির সততা ফিলিং স্টেশনে গত সোমবার রাত আটটায় তেলের গাড়ি আসার খবর পেয়ে তখন থেকে বিভিন্ন গাড়ির চালক ও মালিকেরা ভিড় করতে থাকেন।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম শাহাদাত ইমামকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। জানান, দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ভয় হচ্ছে তিনি যখন পাম্পের কাছে যাবেন, তখন হয়তো তেল ফুরিয়ে যাবে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শাহাদাত ফোন করে জানান, সোয়া পাঁচ ঘণ্টা লাইনে থাকার পরও তিনি তেল নিতে পারেননি। পাম্পের কাছে যেতেই তেল শেষ হয়ে গেছে।

রাজশাহী জেলায় মোট ৪৪টি পাম্প রয়েছে। সব কটির অবস্থা একই। পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নগরের লতা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মনিমুল হক দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, ঈদের পর তিনি তেল নেননি, কারণ তিন হাজার লিটার পেট্রোল আর তিন হাজার লিটার অকটেন দেওয়া হবে, কিন্তু বাঘাবাড়ি থেকে আনতে গাড়ি ভাড়া করে যাচ্ছে ১৫ হাজার টাকা। যে পরিমাণ কমিশন পাওয়া যাবে তা গাড়ি ভাড়ার মধ্যে চলে যাবে। আগামীকালও এভাবেই তেল দেওয়া হবে । সাড়ে চার হাজার লিটার করে দিলেও তিনি নেবেন না, পোষাবে না।

তেল সংকটের কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন জানিয়ে মমিনুল হক বলেন, আজ সকাল ৯টার দিকে তাঁর পাম্পে নাম্বার প্লেটহীন একজন বাইকার এসে চিৎকারে শুরু করেন। হুমকি দেন, পেট্রল পাম্পে আগুন ধরিয়ে দেবেন। এই বলে তাঁর গাড়ি ফেলে রেখে চলে যান। তারপর পুলিশ ডেকে বিষয়টির সুরাহা করা হয়।

তিনি বলেন এই সময়ে যাদের গাড়ির কাগজ, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং হেলমেট রয়েছে, চারজন পুলিশের মাধ্যমে এটা সনাক্ত করে তাদেরই তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করলে তারা এই যন্ত্রণা থেকে রেহাই পান। এবং সংকট দূর হবে।