বাড়াইকদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি যন্ত্রপাতিসহ নানা উপকরণ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে
বাড়াইকদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি যন্ত্রপাতিসহ নানা উপকরণ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে

হাঁসলি থেকে পাতিচখা, এক উৎসবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শত বছরের ঐতিহ্য

হাঁসলি, হাঁসুলি, হাইকেল—নামগুলো আলাদা শোনালেও সবই প্রায় কাছাকাছি ধরনের অলংকার। বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শত বছরের জীবনযাপনের সঙ্গে এ অলংকারগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জীবনের বাঁকে বাঁকে বহু পরিবর্তন হয়েছে। ছুটে চলার গতিতে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক কিছুই। তবু প্রথা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির প্রয়োজনে অনেক কিছু এখনো টিকে আছে।

শুধু অলংকার নয়, পরিবর্তনের হাওয়ায় খাদ্য সংস্কৃতিতেও বদল এসেছে। সংযোজন ঘটছে নতুন কিছুর। তবু নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ছিল, এমন উপকরণগুলো উৎসব-পার্বণকে উপলক্ষ করে এখনো টিকে আছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এই ঐতিহ্য, এই সৌন্দর্যকে একটি উৎসবে একই ছাদের নিচে দেখা গেল।

প্রদর্শিত অলংকার, খাদ্যোপকরণ বাঙালিসহ অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে পরিচিত করা হয়েছে। খাদ্যের ভিন্ন স্বাদ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে ‘হারমনি ফেস্টিভ্যাল’–এ এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় এ উৎসবের আয়োজন করে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম।

শুক্রবার বিকেলে ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে গিয়ে দেখা গেল, অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। তখনো উৎসবের উদ্বোধন হয়নি। বর্ষায়Ñমাঠের চারপাশে ঘন হয়ে আছে চা-গাছের গাঢ় সবুজ। প্রতিটি ছায়াবৃক্ষও সবুজের ছায়া ধরেছে। তবে বিকেলের ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। আগের রাতের বৃষ্টিতে মাঠের সবুজ ঘাসের নিচে পানি জমেছে। পা ফেললেই কাদাপানি ভেসে উঠছে।

উৎসবের বিশাল প্যান্ডেলের ভেতরে বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ জড়ো হয়েছেন। প্যান্ডেলের নিচে কার্পেট ও ত্রিপল বিছানো হলেও অনেক স্থানেই পানি উঠেছে। এর মধ্যে টেবিলে টেবিলে ঐতিহ্যের নানা উপকরণ সাজিয়ে রেখেছেন নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ। অলংকার ও কৃষির নানা হাতিয়ারের পাশাপাশি আছে নানা ধরনের আদিবাসী খাবার। এতে মিশে আছে শত বছরের জীবনযাপন, ভালোবাসা। অনেকটাই বিলুপ্তির পথে—তবু জীবনের প্রয়োজনে টিকে আছে অনেক কিছু।

মণিপুরি, সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, ওঁরাও, শবর, গঞ্জু, কড়া, গৌড়, ত্রিপুরা, কন্দ, তেলেগু, রিকিয়াশন, বাড়াইক, খাড়িয়াসহ ২৭টির মতো জাতিসত্তার মানুষ হারমনি ফেস্টিভ্যালে নিজের জীবন-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির ছিলেন। টেবিলে টেবিলে প্রদর্শন করা হয় অলংকার, পোশাক ও খাদ্য। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ও নাম আলাদা হলেও অনেক অলংকারের গঠন, আকৃতি ও ব্যবহারের ধরন প্রায় কাছাকাছি দেখা যায়।

সাঁওতালদের টেবিলটি রুপা ও গিল্টি করা ঐতিহ্যের অলংকারে সাজানো ছিল। অলংকারের মধ্যে ছিল নাতুনি (পায়ে পরার), হাতের বালা, হাঁসলি (গলার মালা), কানের দুল, খোঁপার কাঁটাসহ বিভিন্ন উপকরণ। স্বপন সাঁওতাল জানান, সিলেট অঞ্চলের সাঁওতালদের মধ্যে নানা কারণে অলংকারগুলোর ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কন্দরা নিয়ে এসেছেন মারুয়া (কাঠের তৈরি চাল বা গম কোটার একধরনের যন্ত্র), কোদাল, ঘটি, তাকলদা (দা), হাতের খাকসা (বালা), হাতের কঙ্কণ, হাতের বাজু (বালা), কানকা (দুল), গড়মোল (পায়ে পরার), কলস ইত্যাদি। রবীন কন্দ বলেন, এগুলোর এখন আর নিয়মিত ব্যবহার হয় না। মাঝেমধে৵ বিয়েশাদিতে ব্যবহৃত হয়।

গৌড় সম্প্রদায়ের টেবিলে ছিল শিরবান্দি/বিন্দিয়া (আধখানা মুকুটের মতো মাথায় দেওয়ার), খাড়ু (চুড়ি), জুটিয়া (পায়ের আংটি), গড়মোল (পায়ের চুড়ি), হাইকেল (গলার মালা), হাঁসুলি (গলার হার), তাড়কি (কানের দুল), পেইয়ি (নূপুর), খারেটা (ঝাড়ু), লটা (লোটা), তাসলা (ডেগ), গাগরা (কলস), কারেইয়া (কড়াই), পারেইয়া (ঢাকনা), দাউলি (দা), সুপা (কুলা), তির-ধনুক ইত্যাদি। শ্রীকান্ত গৌড় বলেন, এসবের অনেকটা বিলুপ্তির পথে। শুধু যেগুলো বিয়েশাদিতে লাগে, যেগুলো না হলে বিয়ে হয় না, সেগুলো টিকে আছে।

বিভিন্ন খাবার নিয়ে গারো তরুণীরা। শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে

মাটির তৈরি পূজার বিভিন্ন উপকরণ সাজানো ছিল রিকিয়াশনদের টেবিলে। হাঁসলিসহ কিছু উপকরণ আছে। দুই তরুণী কাগজে তাঁদের ঐতিহ্যের নানা উপকরণের নাম লিখছিলেন। সোনালি রিকিয়াশন বলেন, মাটির তৈরি কলসসহ অন্যগুলো বিয়ের সময় লাগে। এগুলোর মাধ্যমে বর-কনেকে আশীর্বাদ করা হয়। এগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। যেগুলো ব্যবহার করতে হয়, আমরা সেগুলো সংরক্ষণ করি। বাকিটা হারিয়ে যাচ্ছে।

গারো তরুণীরা নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার। এর মধ্যে ছিল কলাপাতার পিঠা, ললপটি মানটি (পিঠা), মিমুল মি (বিন্নি চালের ভাত, সঙ্গে ছিল শুঁটকির ভর্তা ও কাঁচা মরিচের চাটনি) ইত্যাদি। পিংকি হাজং বলেন, ‘যখন মন চায়, আমরা এখনো এগুলো করে খাই।’

বাড়াইকদের টেবিলেও সাজানো ছিল বেশ কিছু অলংকার। সঞ্চিতা বাড়াইক বলেন, ‘এই অলংকার তৈরি এখন অনেক এক্সপেনসিভ হয়ে গেছে। যে কারণে অনেকগুলো হারিয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে পরিচিত করতে আমাদের আগের মানুষ এগুলো ব্যবহার করতেন। এ জন্য এগুলোকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করছি।’

খাড়িয়া কয়েকজন নারী টেবিলের ওপরেই ‘পাতিচখা’ তৈরি করছিলেন। চা-শ্রমিক নারীরা চা-বাগানে কাজের সময় এই পাতিচখা খেয়েই দুপুরের আহার সারেন। কচি চা-পাতা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ-রসুন, নাগা মরিচ, ধনেপাতা, চানাচুর ও চাল ভাঁজা দিয়ে এই পাতিচখা তৈরি করা হয়। নমিতা ভর ও বীণা ইংগুয়ার জানান, তাঁরা সব সময় চা-বাগানে এই পাতিচখা খান। পাতিচখাকে সবার মধ্যে পরিচিত করতেই এখানে তৈরি করে বিক্রি করছেন।

খাসিদের ঐতিহ্যবাহী মাচাং পিঠাসহ কয়েক জাতের পিঠা দিয়ে সাজানো হয়েছিল তাদের টেবিল। ড্রেসি পতাম বলেন, ‘আমাদের ট্র্যাডিশনাল খাবারগুলো এখনো খাওয়া হয়। তবে বেশি খাওয়া হয় উৎসবের সময়।’ মণিপুরিরা তাদের তৈরি চিড়াভাজা, চিড়ার মোয়াসহ বিভিন্ন খাবার এবং ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি তাঁত ও তাঁতের তৈরি কাপড় প্রদর্শন করেন। মুন্ডাদের টেবিলেও ছিল অনেক রকম অলংকারসহ বিভিন্ন উপকরণ।

বৃহত্তর সিলেট মুন্ডা সমাজকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লক্ষণ মুন্ডা বলেন, ‘এই অলংকারগুলো অকেশনালি অনুষ্ঠানে লাগে। ট্র্যাডিশনালি এগুলো ব্যবহারের নিয়ম থাকায় এখনো আছে। না হলে হারিয়ে যেত।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রউফ প্রথম আলোকে বলেন, সিলেট অঞ্চলে ২৭টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আছে। ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে একটি কালচারাল ভিলেজ গড়ে তোলা হবে। সন্ধ্যার পর কালচারাল অনুষ্ঠান হবে। পর্যটকেরা আকৃষ্ট হবেন। এ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করাই হচ্ছে তাঁদের উৎসবের লক্ষ্য।

উৎসবের অংশ হিসেবে সন্ধ্যার মঞ্চে চলছিল নৃত্যসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নানা আয়োজন। প্যান্ডেলের ভেতরে গুমোট গরম থাকলেও বাইরে বইতে শুরু করে চা-বাগানের সবুজমাখা পিলপিলে ঠান্ডা হাওয়া। আগামী রোববার পর্যন্ত চলবে এই উৎসব।