
হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে পবা, বাঘা ও গোদাগাড়ীতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ মোট ৩০৯ দশমিক ৫৯ হেক্টর।
পদ্মা নদীর পানি বাড়ায় রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চরে আবাদ করা বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, কয়েক দিন পানিতে ডুবে থাকায় পটোল, শসা, করলা, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সব ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। অনেক কৃষক পানি সরিয়ে ও জমির আল উঁচু করে ফসলের বড় একটি অংশ রক্ষা করতে পেরেছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পবা উপজেলার কসবা পদ্মার চরের বিভিন্ন জমিতে কয়েক দিন পানি জমে ছিল। এতে অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু পবা নয়, রাজশাহীর বাঘা, গোদাগাড়ী উপজেলাতেও বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গতকাল রোববার দুপুরে পবা উপজেলার আলিমগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষকের আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোর গাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। খেতে থাকা পটোল, করলা, লাউ, শসাসহ বিভিন্ন ফসল পচে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে নষ্ট হওয়া খেত আবার ফসল ফলানোর জন্য তৈরি করছেন।
এখন যেটুকুন পটোলের গাছ ভালো আছে, সেটুকুনও তো মরে যাছে। তাহলে তো সবই শেষ। আমরা কী করে বাঁচব?আকবর আলী, কৃষক
আলিমগঞ্জে কৃষক আকবর আলীকে নষ্ট হওয়া পটোলগাছ জমি থেকে সরাতে দেখা যায়। তিনি বলেন, তাঁর এক বিঘা পটোল, ১০ কাঠা শসা ও পাঁচ কাঠা ঝিঙের আবাদ পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পটোলের গাছ পচে যাওয়ায় সেগুলো জমি থেকে তুলে ফেলে দিতে হচ্ছে। আকবর আলী বলেন, ‘এখন যেটুকুন পটোলের গাছ ভালো আছে, সেটুকুনও তো মরে যাছে। তাহলে তো সবই শেষ। আমরা কী করে বাঁচব?’
কসবা এলাকার কৃষক মো. নজরুল ইসলাম জানা, তাঁর খেতে প্রায় সাত দিন পানি জমে ছিল। এতে তাঁর প্রায় ১০ কাঠা করলা, ১০ কাঠা শসা, ১০ কাঠা লাউ, দেড় বিঘা বিভিন্ন ধরনের কপি, ১৫ কাঠা পটোল ও পাঁচ কাঠা টমেটোর আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নজরুল ইসলামের হিসাব অনুযায়ী, টমেটোতে প্রায় ১০ হাজার টাকা, পটোলে ৩০ হাজার, করলায় ১০ হাজার, শসায় প্রায় ২০ হাজার, লাউয়ে ১৫ হাজার ও কপিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁর বেশ ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন এসে জমি দেখে গেলেও এখনো কোনো সহায়তা পাননি।
আরেক কৃষক শাহরিয়ার রহমানের হিসাবে, তাঁর প্রায় ১০ হাজার কপি নষ্ট হয়েছে। ফসলগুলো টিকে থাকলে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা বিক্রির আশা ছিল তাঁরা। তিনি বলেন, ‘আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ফসল বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সম্ভব হয়নি।’
উজান থেকে পদ্মার পানি বাড়ার কারণে চরটি ডুবে যায়। এতে পটোল, শসা, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।মো. জহুরুল হক, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, পবা
পটোলচাষি মো. শামিম আল মামুন বলেন, তাঁর ১৫ কাঠা পটোলের আবাদ পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে অন্তত দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, রাজশাহীর পবা, বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলায় হঠাৎ বন্যাকবলিত বিভিন্ন ফসলের জমির পরিমাণ মোট ৩০৯ দশমিক ৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে শাকসবজি ৪৫ দশমিক ২৪ হেক্টর, মাষকলাই ৮৫ দশমিক ৩৯, রোপা আমন ১১ দশমিক ৪৬, রোপা আউশ ২৫, হলুদ ১০২, পেঁপে ২৫, পেয়ারা ১০ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর জমি বন্যাকবলিত হয়েছে।
কৃষি বিভাগের নথি অনুযায়ী, পবা উপজেলায় সবজির ৭ দশমিক ২৪, মাষকলাইয়ের ৬ দশমিক ৩৯ এবং রোপা আমনের শূন্য দশমিক ৪৬ হেক্টর জমি বন্যাকবলিত হয়েছে। গোদাগাড়ীতে সবজি ১০, মাষকলাই ১৭ ও রোপা আউশ ২৫ হেক্টর জমি বন্যাকবলিত হয়েছে। বাঘায় সবজি ২৮, মাষকলাই ৬২, রোপা আমন ১১, হলুদ ১০২, পেঁপে ২৫, পেয়ারা ১০ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর বন্যাকবলিত হয়েছে।
গতকাল পবা উপজেলার কসবা এলাকায় পরিদর্শন করতে দেখা গেছে উপজেলার আলিমগঞ্জ ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহুরুল হককে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, উজান থেকে পদ্মার পানি বাড়ার কারণে চরটি ডুবে যায়। এতে পটোল, শসা, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পদ্মা নদীর আশপাশের এলাকা এবার প্লাবিত হয়েছে। এতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করার কাজ চলছে। এ ব্যাপারে কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে।মোস্তাফা কামাল হোসেন, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহী
জহুরুল হকের দাবি, কৃষকেরা আল উঁচু করে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল রক্ষা করতে পেরেছেন। তাঁরা মাঠপর্যায়ে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকার কাজ করছেন। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত ফসল কীভাবে পরিচর্যা করে ভালো করা যায়, সে পরামর্শও দিচ্ছেন।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহীর উপপরিচালক মোস্তাফা কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা নদীর আশপাশের এলাকা এবার প্লাবিত হয়েছে। এতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করার কাজ চলছে। এ ব্যাপারে কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে।