দিনাজপুরে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট হাতে উচ্ছ্বসিত কৃতী শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে
দিনাজপুরে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট হাতে উচ্ছ্বসিত কৃতী শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

দিনাজপুরে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা

৪৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বাবার সঙ্গে স্বপ্নের মঞ্চে

ওয়ারিনা ফিহার কাছে রাতটা যেন অকারণেই দীর্ঘ হচ্ছে। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কয়েক দিন ধরেই সে অপেক্ষা করছিল একটি বিশেষ দিনের জন্য। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর প্রথম আলোর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ভাবনাই তাকে উচ্ছ্বসিত করে রেখেছিল। আজ রোববার সকাল হতে না হতেই বাবাকে তাড়া দিতে শুরু করে। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে বাবার মোটরসাইকেলে চেপে দিনাজপুরে আসে ওয়ারিনা। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড়, সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

ওয়ারিনার বাবা ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘মেয়ে কয়েক দিন ধরেই অনুষ্ঠান নিয়ে খুব আবেগাপ্লুত ছিল। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেই প্রস্তুত হয়েছে। অন্য দিন ওর মা ওকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। মেয়ের আনন্দের জন্য এতটা পথ এসেছি। আসার সময় পথে ওর এক বন্ধুকে পেলাম। ওকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছি।’

‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার দিনাজপুর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী একাডেমি প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ওয়ারিনা ফিহার মতো দেড় হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে একাডেমি প্রাঙ্গণ। কেউ এসেছে মা–বাবার হাত ধরে, কেউ ভাইবোন বা বন্ধুদের নিয়ে। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে কেউ আলিঙ্গন করছে, কেউ ব্যস্ত স্মৃতির ছবি তুলে রাখতে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন অতিথিরা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা আবদুল কবিরের গল্পও ভিন্ন। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর এখন সে দিনাজপুরে থেকে উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনুষ্ঠানস্থলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলছিল, ‘অনেক দিন ধরে এমন অনুষ্ঠান দেখছি। ভাবতাম আমি কবে অংশ নেব! আজ নিজেই সংবর্ধিত হচ্ছি, ভাবতেই দারুণ লাগছে। ঠাকুরগাঁওয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল; যেহেতু দিনাজপুরে কোচিং করতেছি, তাই এখানেই নিবন্ধন করেছি।’

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। পরে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি ছিল গেমস, অভিজ্ঞতা বিনিময়, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও নতুন বন্ধু তৈরির সুযোগ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর রংপুরের সাবেক নিজস্ব প্রতিবেদক আরিফুল হক। এরপর অন্যান্য অতিথিদের মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বলেন, ‘জিপিএ-৫ পাওয়া অবশ্যই একটি বড় অর্জন। তবে জীবনে সফল হতে হলে শুধু ভালো ফল করলেই হবে না, ভালো মানুষও হতে হবে। দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।’

দিনাজপুরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নেয় কৃতী শিক্ষার্থীরা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখতে হবে, সেই স্বপ্ন পূরণে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক কে এম জাকারিয়া বলেন, ‘এই উৎসব শুধু সংবর্ধনা নয়; এটি স্বপ্ন দেখানোর একটি আয়োজন। আজ যারা এখানে উপস্থিত, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দেবে, গবেষক হবে, চিকিৎসক-প্রকৌশলী হবে। নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেলফি তুলছেন শিখোর কর্মকর্তারা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে দিনাজপুর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল জলিল আহমেদ, বন্ধুসভার উপদেষ্টা শাহজাহান সাজু, ডিসি রায়, প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি রাজিউল ইসলাম, বিরামপুর প্রতিনিধি নুরে আলম সিদ্দিকী, আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা বেলালুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি মুনিরা শাহনাজ চৌধুরী।

আলোচনা অনুষ্ঠান, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণী পর্ব শেষে সংগীত, নৃত্য ও ব্যান্ডসংগীতে মুখর হয়ে ওঠে মঞ্চ। এতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। দিনাজপুরের স্থানীয় ব্যান্ডদল ‘ধূলিকণা’ সংগীত পরিবেশন করে।

দিনাজপুরে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দলীয় নৃত্য পরিবেশনা। রোববার সকালে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলনায়তনে

এবারের আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।