সংবর্ধনা ক্রেস্ট হাতে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। আজ সকালে রংপুর শহরের শিশু নিকেতন উচ্চবিদ্যালয় মাঠে
সংবর্ধনা ক্রেস্ট হাতে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। আজ সকালে রংপুর শহরের শিশু নিকেতন উচ্চবিদ্যালয় মাঠে

রংপুরে জিপিএ–৫ সংবর্ধনা

‘কঠোর পরিশ্রম করেছি, প্রাপ্য হিসেবে আজ সংবর্ধনায় এসেছি, খুব ভালো লাগছে’

সকালের আলো তখনো তীব্র হয়ে ওঠেনি। রংপুর শিশু নিকেতন উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে একে একে জড়ো হচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মগ্ন, কেউ তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকে। তবে সবার পরিচয় এক, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তারা।

আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিদ্যালয়টিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ২০২৬’। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রংপুর অঞ্চলের জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে।

মাঠে দেখা মেলে দুই বন্ধু মো. সোয়াদ ও মো. জুনাইদের। তারা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। দুজনেরই কারমাইকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়েছে। লক্ষ্য প্রকৌশলী হওয়া। জুনাইদ বলে, ‘জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দ তো আছেই। তার ওপর সংবর্ধনা পাওয়া সেই আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্বপ্ন বাড়ছে।’

সোয়াদের পথটা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন ছিল। তার অনেক বন্ধু প্রাইভেট-কোচিংয়ের সুযোগ পেলেও তার সেই সুযোগ ছিল না। নিজের পরিশ্রমকেই ভরসা করেছে সে। সোয়াদ বলে, ‘কঠোর পরিশ্রম করেছি। প্রাপ্য হিসেবে আজ সংবর্ধনায় এসেছি। খুব ভালো লাগছে।’

লাইনে দাঁড়িয়ে উপহারসামগ্রী সংগ্রহ করছে শিক্ষার্থীরা

এই মাঠে আসা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনের গল্প এক নয়। কেউ এসেছে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয় থেকে, কেউ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। কারও পেছনে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, আবার কারও সামনে এখনো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

পীরগঞ্জের বড়দরগা থেকে এসেছে মায়িশা ফাহমিদা। মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর এবার তার লক্ষ্য বিজ্ঞান বিভাগে কলেজে পড়া। সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়েছে। তবে পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে তার।

তারাগঞ্জের ছুট লক্ষ্মীপুর থেকে বাবা কেরামত আলীর ইজিবাইকে করে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছে নাদিয়া আফরিন। অভাবের মধ্যেই পড়াশোনা করে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। নাদিয়া বলে, ‘অনেক দিন না খেয়ে স্কুলে গেছি। ধারদেনা করে বাবা ফরম পূরণের টাকা দিয়েছেন। সেগুলো উতরে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। পরিবার-প্রতিবেশী, আমি সেই ফলাফলে খুব আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু কলেজে পড়ার খরচ এখন সেই আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার পথে।’

শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, সন্তানের সাফল্যের সঙ্গে অভিভাবকদের জীবনসংগ্রামও মিশে আছে। মিঠাপুকুর থেকে ছেলেকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অভিভাবক মিজানুর রহমান। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। এখন একটি ওষুধের দোকানে ৭ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। পাশাপাশি ২২ শতাংশ জমি চাষ করেন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরা

মিজানুর রহমান বলেন, ‘লেখাপড়া না থাকার কষ্ট আমি জানি। ২২ শতাংশ জমির চাষাবাদ আর বেতনের ৭ হাজার টাকায় সংসার চালিয়ে একবেলা খেয়ে না–খেয়ে ছেলেকে পড়িয়েছি। ছেলে সেই কষ্টের দাম দিয়েছে। আমার ইচ্ছা ছেলেকে চিকিৎসক বানাব।’

মাঠজুড়ে তখন ক্রেস্ট ও উপহার নেওয়ার ব্যস্ততা। ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মঞ্চের আয়োজন—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ। তবে এই আনন্দের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়েছে নতুন বাস্তবতা। বিদ্যালয়ের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে এবার শুরু হবে কলেজজীবন।

বিভিন্ন বুথে শিক্ষার্থীদের ভিড়

প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশের ৬৪ জেলায় ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। রংপুরের আয়োজনেও সংবর্ধনার পাশাপাশি ছিল অতিথিদের বক্তব্য, কৃতী শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।