নেত্রকোনার ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, ভুগাই, উব্দাখালি, মগরাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি ধনু নদের খালিয়াজুরি উপজেলার রসুলপুর ঘাট থেকে তোলা
নেত্রকোনার ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, ভুগাই, উব্দাখালি, মগরাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি ধনু নদের খালিয়াজুরি উপজেলার রসুলপুর ঘাট থেকে তোলা

নেত্রকোনায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি, ধান ঘরে তোলা নিয়ে আশঙ্কায় হাওরের কৃষক

নেত্রকোনার ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, ভুগাই, উব্দাখালী, মগরাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গত এক সপ্তাহ থেমে থেমে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো অকালবন্যায় ফসল হারাতে হতে পারে।

স্থানীয় কৃষক, জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার আংশিক এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল। হাওরের একমাত্র ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সামাজিক অনুষ্ঠান। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওর রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক দিনে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ ভারতের চেরাপুঞ্জি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত খালিয়াজুরির ধনু নদে প্রায় চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া কংস ও সোমেশ্বরী নদীতেও পানি বেড়েছে।

হাওরের সব খেতের ধান এখন পেকে গেছে। তবে অধিকাংশ খেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র চালানো সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিক–সংকটও রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত থাকায় কৃষকেরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন। গতকাল খালিয়াজুরিতে বজ্রপাতে তিনজন নিহত হন। ধনু নদে পানি বাড়ায় খালিয়াজুরির চুনাই হাওর, বাইদ্যার চর, কাটকাইলেরকান্দা, নন্দের পেটনা, কীর্তনখোলাসহ বেশ কয়েকটি হাওরের বেড়িবাঁধের কাছে পানি চলে এসেছে।

খালিয়াজুরির পুরানহাটি গ্রামের কৃষক শামছুল আলম বলেন, ‘ধনু নদের পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন হাওরের নিচু স্থান ও বেড়িবাঁধের কাছে পানি জমেছে, এ নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি। হাওরে এখনো ৫৮ শতাংশ জমির ধান কাটার বাকি।’ জগন্নাথপুরের কৃষক ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘মরা ধনু পানি ভইরা কীর্তনখোলা বাঁধের কাছে পানি আইছে। আরেকটু পানি বাড়লে বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। ফসল কাটতে পারতাছি না। প্রতি শ্রমিকের রোজ দিতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকার উপরে। তেও কামের লোক পাওয়া যায় না। কত টাকা খরচ কইরা ধান চাষ কইরা কোনো লাভ নাই। অহন ফসল ঢুকে গেলে এক্কেবারে পথে বইয়াম।’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৯ সেন্টিমিটার। কিন্তু সেখানে এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। আর সবগুলো বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে আজ থেকে আরও পানি বাড়বে, এতে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। সোমবার বিকেল পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে তবে এখনো হাওর নিরাপদ আছে। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সে জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি। আমাদের ইউএনওরা মাঠে আছেন, তাঁদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সে ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’