ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় আকরাম গ্যাসলাইটার কারখানার শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রাখা হতো। কেউ বকেয়া বেতন চাইলে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হতো। কারখানা থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজন শ্রমিক ও তাঁদের স্বজনেরা আজ সোমবার এমন অভিযোগ করেন।
কারখানার কর্মচারী মাহবুব হোসেনের বোন লিজা বেগম বলেন, ‘কারখানা থেকে ভাই দুই মাসের বেতন ২০ হাজার টাকা পাবে। ভাই অনেক আকুতি–মিনতি করল, তারা বেতন দেয়নি। শনিবার আগুন লাগার দিন ভাই কারখানার অন্য লোকজনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের শরীর পুড়িয়ে ফেলেছে। অথচ ভাইয়ের অসুস্থতার চেয়ে বকেয়া বেতন নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছি। প্রশাসনের উচিত, কারখানার মালিকপক্ষের কাছ থেকে ভাইয়ের বেতন আদায় করে দেওয়া।’
গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেরানীগঞ্জের কদমতলী আমবাগিচা ডিপজলের গলিতে অবস্থিত মেসার্স এসার গ্যাস প্রো ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগে। এতে ছয়জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ, যার মধ্যে একজন শিশু ও দুজন নারী রয়েছেন।
কারখানার কিশোর শ্রমিক জিসান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। পবিত্র রমজান মাসে জিসান বেতন চাওয়ায় তাকে মারধর করা হয় উল্লেখ করে তার মা সেলিনা বেগম বলেন, ‘পেটে ভাত দেওয়ার লাইগা পোলারে কামে দিছি। দুই মাসের বেতন তো পাই–ই নাই, অহন পোলাডা মরণের পথে। আমার পোলার মতো অনেকের লগে ওরা এমন করছে। সরকার যেন ওগো বিচারটা করে।’
আজ সোমবার দুপুরে সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে। রোদের তাপ বেশি থাকায় ধ্বংসস্তূপে থাকা গ্যাসলাইটার দফায় দফায় ফুটে উঠছে। ঘটনাস্থলটি পুলিশ, র্যাব ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা পাহারা দিচ্ছেন। এ সময় কারখানার শ্রমিকেরা বকেয়া বেতনের জন্য কারখানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হন।
আগানগর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ সোহেল মিয়া বলেন, ‘আমাকে এই জায়গা পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎসুক কেউ যাতে এখানে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখছি।’
আজ সকালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা মর্গের সামনে ভিড় করছেন।
মর্গে দায়িত্বরত কর্মী মোহাম্মদ মিলন বলেন, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া তিনজনের পরিচয় আজও শনাক্ত হয়নি। তাঁদের লাশ মর্গে পড়ে আছে।
এ ঘটনায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওমর ফারুক বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কারখানায় লাইটারগুলো গ্যাসচুল্লির কাছে জড়ো করে কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে সেগুলো চুল্লির সংস্পর্শে এসে আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি আরও বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজ বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে।
এদিকে গ্যাসলাইটার কারখানায় আগুনের ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার কেরানীগঞ্জ সিট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও বিএনপি নেতা মো. ইমান উল্লাহকে (৫০) তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানভীর আহমেদ এই আদেশ দেন।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, গ্রেপ্তার ইমান উল্লাহকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে এনে তাঁকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি আরও বলেন, এ মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।