মাত্র দুজন স্থায়ী শিক্ষক দিয়ে চলছে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। ছবিটি গত ৩০ সেপ্টেম্বর তোলা
মাত্র দুজন স্থায়ী শিক্ষক দিয়ে চলছে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। ছবিটি গত ৩০ সেপ্টেম্বর তোলা

জকিগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

দুজন শিক্ষক দিয়ে টেনেটুনে চলছে ৪৮৬ ছাত্রীর স্কুল

শিক্ষাবর্ষের নয় মাস শেষ। এ দীর্ঘ সময়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে ক্লাস পেয়েছে দশম শ্রেণির ছাত্রীরা। বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের শিক্ষক মাত্র একজন। কিন্তু তাঁকে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত অন্য বিষয়ে ক্লাস নিতে হয়। তাই ৯ মাসেও নিজের বিষয়ের ক্লাস নেওয়ার সুযোগ পাননি তিনি।

শিক্ষকসংকটের এই খণ্ডিত চিত্র সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের। ৫৭ বছরের পুরোনো নারী শিক্ষার এ বিদ্যালয়টিতে এখন ৪৮৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। কিন্তু সরকারি শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। ফলে প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে অস্থায়ীভাবে কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়া হয়েছে। তাতেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। প্রসঙ্গত সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী মাধ্যমিকে গড়ে ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা।

বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বললেন, ‘বিদ্যালয়ে আমরা দুজন শিক্ষক। দুজনকেই প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত টানা সাত পিরিয়ড ক্লাস নিতে হয়। এমনকি অনেক দিন টিফিন পিরিয়ডেও ক্লাস নিতে হয়। এক বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে। খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।’

শিক্ষকেরা আসতে চান না

জকিগঞ্জ উপজেলায় ১৯৬৯ সালে জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৮ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি হয়। জকিগঞ্জ উপজেলা সিলেট শহর থেকে ৯১ কিলোমিটার দূরে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভারত সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জের দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেক শিক্ষক এখানে যেতে চান না। কাউকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হলেও কিছুদিন পর চেষ্টা-তদবির করে শহর কিংবা পছন্দের কোনো বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে চলে আসেন। ফলে জকিগঞ্জের বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকসংকট লেগেই থাকে।

জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ আছে ১০ টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বিদ্যালয়টিতে পাঁচজন শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ওই বছরের মার্চ, এপ্রিল ও ৭ জুলাই মাসে তিনজন শিক্ষক বদলি হয়ে যান। বর্তমানে কর্মরত আছেন সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক ও ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন। দুজনেরই চাকরিজীবনের প্রথম নিয়োগ এই বিদ্যালয়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়টির একজন সাবেক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, চাকরিজীবনের প্রথম পদায়ন হিসেবে শিক্ষককে এ বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু কিছুদিন পর চেষ্টা-তদবির করে অনেকে বদলি হয়ে চলে যান। পুরোনো ও অভিজ্ঞ শিক্ষকই এখানে আসতে চান না।

একই শিক্ষক পড়ান অনেক বিষয়

জকিগঞ্জ পৌর শহরের পীরেরচক এলাকায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষেই ছাত্রীর উপস্থিতি বেশ ভালো। শিক্ষকেরা পাঠদান করছেন।

দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী সুহাদা জান্নাত ও নুরুন্নাহার প্রভা জানায়, শিক্ষকসংকটের কারণে তাদের সুষ্ঠু পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হওয়ায় অনেক সময় বিষয় বুঝতে সমস্যা হয়।

শিক্ষকসংকটের কারণে একই শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের পাঠদান করতে হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে

একাধিক ছাত্রী জানায়, পৌরনীতি ও সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ের অনেক কিছুই তারা বুঝতে পারে না। এতে তারা কাঙ্ক্ষিত পাঠ পাচ্ছে না।

দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুল নুসরাত ও সালমা তাবাসসুম জানায়, বিদ্যালয়ে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। মাঝেমধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞানাগারের ক্লাস হয়। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। কম্পিউটার ল্যাবের বেশির ভাগ ল্যাপটপও অকেজো। এ ছাড়া বিজ্ঞানের কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই।

ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন বলেন, একেকটি শ্রেণিতে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জন ছাত্রী উপস্থিত থাকে। শিক্ষকসংকটের কারণে কোনো শ্রেণিতেই সেকশন করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, এত সংকটের মধ্যেও গত বছর বিদ্যালয়ের পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ২১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ছয়জন ছাত্রী।

শিক্ষার্থীদের টাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষক

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২০০ টাকা নিয়ে বিশেষ তহবিল গঠন করে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিজ্ঞানের দুজন, বাংলার একজন, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার তিনজন রয়েছেন।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। তবে প্রতি মাসে ২০০ টাকা দেওয়ার বিষয়টি অভিভাবকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করায় পরে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘অভিভাবকদের বাড়তি চাপ কমাতেই ২০০ টাকা করে নেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে তহবিলে যে টাকা জমা হয়েছে, তা দিয়ে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন দেওয়া যাবে। এরপর কী হবে, সেটাই ভাবছি। দ্রুত বিদ্যালয়ের শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণ করা গেলে ঠিকমতো পাঠদান করা সম্ভব হবে।’

রুহুল আমিন বিদ্যালয়টিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। মাসে তাঁর বেতন সাত হাজার টাকা। তিনি জানান, সাধারণ গণিতের পাশাপাশি তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতও পড়াতে হচ্ছে। একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়ে পাঠদান করতে গিয়ে সব সময়ই চাপের মধ্যে থাকতে হয়।

সমস্যার যেন শেষ নেই

ছাত্রীদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। কোথাও কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, রং উঠে গেছে। লাইব্রেরি না থাকায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে কয়েকটি আলমারিতে বই রাখা হয়েছে। সেখানে বসে বই পড়ার সুযোগ নেই। মিলনায়তন বা কমন রুমও নেই।

একটি কক্ষে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী চারজন থাকার কথা থাকলেও আছেন দুজন। ফলে শিক্ষকতার পাশাপাশি ভর্তি কার্যক্রম, বেতন আদায়সহ দাপ্তরিক কাজও স্থায়ী ওই দুই শিক্ষককে করতে হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, কম্পিউটার ল্যাবের কক্ষে ধুলো জমে আছে। বিভিন্ন স্থানে মাকড়সার জাল। পুরো কক্ষেই উৎকট গন্ধ। দেখেই বোঝা যায়, বহুদিন ধরে কক্ষটি ব্যবহার করা হয় না। টেবিলের ড্রয়ারে রাখা হয়েছে কিছু ল্যাপটপ। শিক্ষকদের ভাষ্য, ল্যাবের ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৫টিই অকেজো।

একইভাবে ‘গালর্স ফ্যাসিলিটিস এবং ফাস্ট এইড কর্নার’ নামে একটি কক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির বই ও ল্যাবের সরঞ্জাম এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

জেলাজুড়েই শিক্ষকসংকট

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকের সংকট কমবেশি সারা দেশেই আছে। দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি; এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। পৌনে চার শ মতো প্রধান শিক্ষকের পদও খালি। এর মধ্যে সিলেটের উপজেলা পর্যায়ের চিত্রটি বেশি উদ্বেগজনক।

গত ৩০ আগস্ট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সরকারি ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের শূন্য পদের একটা তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। ওই তথ্য অনুযায়ী, জেলার পুরোনো সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে আটটি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২৪৯ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন ১৬২ জন। শূন্য পদ ৮৭ টি। আটটি বিদ্যালয়ের কোনোটিতেই প্রধান শিক্ষক নেই।

কম্পিউটার ল্যাবের কক্ষে ধুলাবালু জমে আছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে

শহরের তুলনায় উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকসংকট বেশি। উপজেলা পর্যায়ের পাঁচটি বিদ্যালয়ের মধ্যে জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ছাড়াও, জকিগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ২৭ জনের বিপরীতে ৯ জন, কানাইঘাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ২৭ জনের বিপরীতে ১১ জন এবং জৈন্তাপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ২৭ জনের বিপরীতে ৯ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এ ছাড়া সিলেট শহরের উপকণ্ঠের দক্ষিণ সুরমা হাইস্কুলে ২৬ জন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫ জন।

অন্যদিকে জাতীয়করণ করা ১০টি বিদ্যালয়ে ১৩৭ জন শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০৯ জন। এ ছাড়া জেলায় এমপিওভুক্ত ৩২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৭১ জন শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ৮৫টি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক এবং ৭২টি প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সিলেট অঞ্চলের পরিচালক মো. দিদার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষকসংকট বাড়ছে। একেকজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় থাকছেন। দীর্ঘদিন ধরে শহরে থাকা শিক্ষকদেরও উপজেলা পর্যায়ে বদলি করা উচিত।