দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি চামড়ার মোকামে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার সকালে
দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি চামড়ার মোকামে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার সকালে

যশোরের রাজারহাট মোকামে চামড়ার ‘দাম পাচ্ছেন না’ বিক্রেতারা

যশোর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রাম থেকে শরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি দুটি গরু ও তিনটি ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর রাজারহাট পাইকারি চামড়ার মোকামে আসেন। মাঝারি আকারের দুটি গরুর চামড়া ৮৫০ ও তিনটি ছাগলের চামড়া বিক্রি করে দাম পান ৬০ টাকা।

শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজেদের কোরবানির গরু-ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে রাজারহাট মোকামে এসেছি। পাইকারি ব্যবসায়ীদের কেউ সরকারি বেঁধে দেওয়া দরের কাছেও দাম বলেনি। পিস হিসেবে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪২৫ এবং বড় আকারের খাসির চামড়া প্রতিটি ২০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হলে দুটি গরুর চামড়ার দাম পেতাম ১ হাজার ২৫০ টাকার বেশি। কিন্তু চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরকারি বেঁধে দেওয়া রেটের বাইরে নিজেদের মতো দাম বলে চামড়া কেনাবেচা করছেন।’

শরিফুল ইসলামের মতো অনেক মানুষ অভিযোগ করেছেন, মোকামে চামড়া বিক্রি করতে এসে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি ও পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা সত্য যে ওই ব্যক্তির দুটি গরুর চামড়া সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হলে ১ হাজার ২৫০ টাকার বেশি দাম পেতেন। কিন্তু আমরা ট্যানারিমালিকদের কাছে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে পারছি না। যে কারণে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’

গিয়াস উদ্দিন আরও দাবি করেন, ট্যানারির মালিকের প্রতিনিধিরা তাঁদের বলছেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কেমিক্যালের দাম বেড়েছে। এ জন্য তাঁরা সরকারি দাম দিতে পারছেন না। লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বেশি। ফলে দিন দিন চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে।

আজ শুক্রবার কোরবানি ঈদের প্রথম দিন দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার পাইকারি মোকাম রাজারহাটে গিয়ে দেখা গেছে, মৌসুমি ও আড়তদার ব্যবসায়ীরা শ্রমিকদের মাধ্যমে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করছেন। কাঁচা চামড়ায় লবণ মাখাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। অনেকে আজও গরুর চামড়া বিক্রি করতে হাটে এসেছেন। কিন্তু সরকারি বেঁধে দেওয়া গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫২ থেকে ৫৫ টাকা দরে কোথাও বেচাকেনা হতে দেখা যায়নি।

৩০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করা যশোর সদর উপজেলার কচুয়া গ্রামের পাগল চাঁদ সরকারি বেঁধে দেওয়া দাম জানেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে কখনো চামড়া বেচাকেনা হয় না। এবারও আমরা পিস হিসেবে চামড়া কিনেছি, পিস হিসেবে বিক্রি করছি। সরকারি রেট আমার জানা নেই।’

গতকাল ঈদের পর পাগল চাঁদ গ্রাম ঘুরে ৫০টি গরু এবং ৬০টি ছাগলের কাঁচা চামড়া কিনেছেন। এসব চামড়া লবণ মাখিয়ে রাখা হয়েছে। শনিবার হাটে তোলা হবে বলে তিনি জানান।

সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে কি না, সেটি তদারক করার দায়িত্ব কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি বেঁধে দেওয়া কাঁচা চামড়ার দাম ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য বাজার তদারকি করা হচ্ছে। আমরা বাজারে গিয়ে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে সচেতন করেছি। আগামী ১৫ দিন জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজারহাট চামড়ার মোকামে গিয়ে তদারকি করবে। সরকারি রেটে চামড়া বেচাকেনা না হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে গতকাল ঈদের দিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজারহাট মোকামে কাঁচা চামড়ার জমজমাট বেচাকেনা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে চামড়া কিনে এই মোকামে এসে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার মানুষ নিজেদের কোরবানির গরু-ছাগলের চামড়া বিক্রির জন্য এই হাঁটে আসেন।

যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে এই মোকামে প্রায় সারা রাত চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। গত রাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার গরু ও ৫ থেকে ১০ হাজার ছাগলের চামড়া বেচাকেনা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচা চামড়ার জমজমাট বেচাকেনার হাট বসে রাতে। আগামীকাল শনিবার ঈদের পর প্রথম হাট বসবে। তবে প্রথম হাট সাধারণত জমে না। দ্বিতীয় হাট জমজমাট হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।