চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় নিখোঁজের সাত মাস পর এক শিশু (১২) বাড়ি ফিরেছে। নিখোঁজ হওয়ার সময় তার দুই পা স্বাভাবিক ছিল। তবে বাড়ি ফেরার পর দেখা গেল শিশুটির একটি পা কাটা।
গতকাল রোববার ভোরে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর তার পরিবারের লোকজন তাকে বাড়ি নিয়ে আসে। শিশুটির অভিযোগ, একটি চক্র ভিক্ষাবৃত্তি করানোর জন্য তার পা কেটে ফেলেছে।
ওই শিশু লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের বাসিন্দা। সে ওই এলাকার একটি মাদ্রাসার হিফজখানায় পড়ত। বর্তমানে সে তার চাচার আশ্রয়ে রয়েছে।
শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর ৯ ফেব্রুয়ারি ১০০ টাকা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে অভিমান করে বের হয়ে যায় সে। পরে ওই দিনই নির্বাচনী প্রচারণার একটি ট্রাকে করে সে কক্সবাজার চলে যায়। এই ট্রাকে তাকে কোনো ভাড়া দিতে হয়নি। কক্সবাজার গিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে তা দিয়ে খাবার কিনত সে। রাত হলে সৈকতেই ঘুমিয়ে থাকত। এভাবেই প্রায় দুই মাস কাটে তার।
শিশুটি জানায়, একদিন এক পর্যটক তাকে ঢাকা গেলে বেশি টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। পরে সে ওই পর্যটকের সঙ্গে বাসে ঢাকা চলে যায়। ঢাকা গিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পানি ও শরবত বিক্রির কাজ করত। বিনিময়ে তিন বেলা খাবার এবং স্টেশনের পাশে একটি ঘরে থাকার সুযোগ দিত একটি চক্র। এভাবে এক মাস কাটার পর একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে সে হাসপাতালে। আর তার ডান পা কাটা।
শিশুটির অভিযোগ, তাকে জানানো হয় সে ট্রেনে কাটা পড়েছে। এ কারণে তার পা কাটতে হয়েছে। তবে পরে সে বুঝতে পেরেছে ভিক্ষাবৃত্তি করতেই তার পা কেটে ফেলা হয়েছে। প্রায় দুই মাস তাকে হাসপাতালে রাখা হয়। দুই মাস পর তাকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। ওই হুইলচেয়ারে করেই সে কমলাপুর এলাকায় ভিক্ষা করত। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকাও ওই চক্রটি নিয়ে যেত।
কীভাবে বাড়িতে এসেছে জানতে চাইলে শিশুটি বলে, গত শনিবার রাতে তাকে ওই চক্রের এক ব্যক্তি ৩৫০ টাকা দিয়ে লোহাগাড়ার চুনতির একটি ধর্মীয় মাহফিলে যেতে বলে। ওই ব্যক্তিই তাকে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের একটি বাসে তুলে দিয়েছে। এরপর ওই বাসে করে সে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় এসেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গতকাল ভোরে চুনতি এলাকার ওই মাহফিলে শিশুটিকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে শিশুটিকে শনাক্ত করেন তার বাবা।
শিশুটির বাবা পেশায় দিনমজুর। শিশুটির মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে। বর্তমানে মা-বাবার আলাদা সংসার রয়েছে। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে শিশুটি তার সৎমায়ের সঙ্গে থাকত।
আজ সোমবার সকালে শিশুটির চাচার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাকে দেখতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এসেছেন। কীভাবে শিশুটি নিখোঁজ হলো, কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, এটি নিয়েই চলছে সবার মধ্যে আলোচনা।
জানতে চাইলে শিশুটির চাচা প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন খবর দেওয়ার পর সেখানে গিয়ে দেখি, তার (শিশুটির) ডান পা কাটা। তার পেটের ডান পাশে ও পেছনে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। তাকে সুস্থ অবস্থায় ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।’
শিশুটির চাচা আরও বলেন, ‘ও নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। তাকে একদিন খুঁজে পাব, সেটা প্রত্যাশা ছিল। তবে এভাবে পাব, সেটা কখনো ভাবিনি। ঢাকায় যাওয়ার পর তার ডান পা কেটে দেওয়া হয়েছে। কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, সবকিছু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
পুলিশ জানায়, শিশুটি নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো জিডি করা হয়নি। এ কারণে নিখোঁজের বিষয়ে তারা অবগত ছিল না। গতকাল শিশুটির বাবা লোহাগাড়া থানায় গিয়েছিলেন। তবে ঘটনা ঢাকায় ঘটার কারণে তাঁকে ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করতে বলে পুলিশ।
জানতে চাইলে লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীর বাবা থানায় এসেছিলেন। যেহেতু ঘটনাটি লোহাগাড়ায় ঘটেনি বলে জানা গেছে, তাই তাঁকে ঘটনাস্থল মতিঝিল থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশুটির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’