শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান পাঠশালার আয়োজনে ‘পাঠশালায় বৈশাখ’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পরিবেশিত নাটকের একটি দৃশ্য। শুক্রবার সকালে সিলেট নগরের কিনব্রিজ এলাকার সারদা স্মৃতি হল প্রাঙ্গণে।
শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান পাঠশালার আয়োজনে ‘পাঠশালায় বৈশাখ’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পরিবেশিত নাটকের একটি দৃশ্য। শুক্রবার সকালে সিলেট নগরের কিনব্রিজ এলাকার সারদা স্মৃতি হল প্রাঙ্গণে।

শঙ্খ, শিঙা বাজিয়ে শত শিশুর বৈশাখ বরণ

সিলেটের সুরমা নদীর পাড়ে ঐতিহাসিক কিনব্রিজের পাশে ১৫২ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আলী আমজদের ঘড়ির কাঁটা নয়ের কোঠায় দাঁড়িয়েছে। তখন বড় রকম আওয়াজে টানা নয়বার টুংটাং শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ঘড়ির শব্দ থামতেই পাশে অবস্থিত ৯০ বছর বয়সী ঐতিহ্যবাহী সারদা হলের সামনের উন্মুক্ত চত্বরের চার কোনায় চারজন দাঁড়িয়ে শঙ্খ বাজাতে থাকেন। মাঝখানে এক নারী শিঙায় ফুঁ দেন।

এভাবেই আবাহন করা হয় বৈশাখকে। পরে এক বংশীবাদক বাঁশিতে সুর তোলেন, ‘সুরমাপারের তীরে আমার ঠিকানা রে’। বাঁশিতে সুরের মাধ্যমে তোলা এ গানের সঙ্গে বাজে কাঠিঢোল, মৃদঙ্গ, মাদল, তবলা, নাল, খমক, একতারা, ঝাঁজসহ নানা দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। এ পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই বাজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল প্রচলিত গান, ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও, যাও গো এবার যাবার আগে’।

রবি ঠাকুরের গান বাজতেই থালায় করে সাত রঙের আবির নিয়ে চত্বরে ঢোকেন ছেলে-মেয়েরা। তাঁরা উপস্থিত সবার গালে আবির লাগান। এর মধ্যেই কাঁধে ভাঁড় নিয়ে আসেন এক ময়রা। তাঁর ভাঁড়ে অর্থাৎ মাটির পাতিলভর্তি ছিল রসগোল্লা। পাতিলের মুখ ছিল পুরোনো পত্রিকা দিয়ে মোড়ানো। সে পত্রিকার সরিয়ে চত্বরে থাকা শত শিশু, কিশোর পাতিলে হাত ঢুকিয়ে রসগোল্লা নিয়ে একের পর এক মুখে পোরে।

সিলেটে শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান পাঠশালার আয়োজনে বৈশাখ বরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করছে পাঠশালার শিশুরা

এমন আনন্দঘন পরিবেশেই আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সিলেটের শিশু-কিশোরদের সংগঠন ‘পাঠশালা’ বৈশাখ মাসকে বরণ করে নেয়। এ উপলক্ষে কিনব্রিজ এলাকার সারদা হলের চত্বরকে সাজানো হয় চমৎকার এক আবহে। নানা রঙের কাগজ কেটে ঝালর তৈরি করে সেসব দড়িতে আঠা দিয়ে লাগিয়ে এপাশ-ওপাশ লাগানো হয়। মাটিতে ত্রিপল বিছিয়ে গ্রামীণ বাউলগানের মঞ্চের মতো আবহ তৈরি করে সাজসজ্জা করা হয়। মুলি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি তরজায় (বেড়া) পুরোনো পত্রিকা সেঁটে প্রস্তুত করা হয় ব্যাকড্রপ।

আবাহন ও মিষ্টি বিতরণের পর উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করে পাঠশালার শিশুশিল্পী সমর্পিতা দে তুন্বা। পরে একে একে দলীয় ও একক গান, নৃত্য, আবৃত্তি পরিবেশন করে শিশু-কিশোরেরা। অনুষ্ঠানে পাঠশালার শিল্পীরা ছাড়াও ‘তন্বী দেবের দল’ দলীয় সংগীত এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুবর্ণযাত্রা’ নাটক ‘আদাব’ মঞ্চায়ন করে। মান্নান হীরা রচিত এ নাটকের নির্দেশনা দেন শেখ মাহমুদ রনি। সবশেষে ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের গানের পরিবেশনা।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল আলোচনা। এতে সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য দেন। সবশেষে সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। পাঠশালার পরিচালক নাজমা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গায়ত্রী রায়, প্রমি দে ও সান্তনা দাশ মৌ।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল আলোচনা। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ২০২৬ সালে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট সফরের শত বছর পূর্ণ হবে। কবির সিলেট আগমনের শত বছর পূর্তি অনুষ্ঠান সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ঘটা করে উদ্‌যাপন করা হবে। সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশে সিটি করপোরেশন কাজ করবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা ও পাঠাভ্যাস বাড়াতে পারলে জাতি হিসেবে তারা আরও এগিয়ে যাবে।

এর আগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে আলোচনায় অংশ নেন সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সাবেক প্রধান পরিচালক অরিন্দম দত্ত চন্দন, নাট্যকার বাবুল আহমদ ও সুদ্বীপ চক্রবর্তী, নাট্যাভিনেতা আশুতোষ ভৌমিক বিমল, সাংস্কৃতিক সংগঠক বিভাষশ্যাম পুরকায়স্থ যাদন, নাট্যনির্দেশক নীলাঞ্জন দাশ টুকু, নাট্যসংগঠক জাফর সাদেক শাকিল, ফয়ছল মো. মহসিন, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমদ, চিকিৎসক ফাতেমা ইয়াসমিন ইমা, সংস্কৃতিকর্মী মাসুম খান, কথাকলি সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সুমন, সাংবাদিক আশরাফুল কবীর, নয়ন নিমু, নাবিল হোসেন ও লুৎফুর রহমান উজ্জ্বল প্রমুখ।

সিলেটে শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতিষ্ঠান পাঠশালার বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিতিদের একাংশ। নগরের কিনব্রিজ এলাকার সারদা স্মৃতি হল প্রাঙ্গনে শুক্রবার সকালে

অনুষ্ঠানে সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি শতাধিক শিশু ও কিশোর এবং তাদের অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে দই-চিড়া দিয়ে আপ্যায়নের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।