আবদুল জব্বার
আবদুল জব্বার

আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার

স্মৃতি শুধু তাঁর একটি ছবি 

বাইরে থেকে দেখায় চকচকে। কিন্তু ভেতরে গেলেই চেয়ার-টেবিলে জমা ধুলার আস্তর চোখে পড়ে। এমন অবস্থা ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের। স্মৃতি জাদুঘরের নাম টিকিয়ে রেখেছে কেবল ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের একটি ছবি।

ময়মনসিংহের ভালুকা-গফরগাঁও আঞ্চলিক সড়কের পাশের পাঁচুয়া মোড়ে রয়েছে একটি তোরণ। সেখানে লেখা ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার নগর’। তোরণ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে সরু সড়ক ধরে এগোলে দেখা মেলে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের।

২০০৮ সালে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের জন্মস্থানে প্রায় ১ হাজার ৪৬০ বর্গফুটের এই স্থাপনা তৈরি করে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ। শহীদ আবদুল জব্বারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পাঁচুয়া গ্রামটির নাম ‘জব্বার নগর’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এখনো সরকারি গেজেট হয়নি।

গ্রন্থাগার ও জাদুঘরের গ্রন্থাগারিক মো. কায়সারুজ্জামান জানান, পাঠাগারে বই আছে ৪ হাজার ১৭৫টি। কিন্তু পাঠক থাকে খুব কম। ফেব্রুয়ারি মাসে পাঠক ও দর্শনার্থী বাড়ে। দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হওয়ার জন্য স্মৃতিস্মারক না থাকার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি। বলেন, ‘দর্শনার্থীরা ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেখতে চান। কিন্তু আমাদের সংরক্ষণে না থাকায় তা দেখাতে পারি না।’

পাঁচুয়া গ্রামে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার পাঠাগার ও স্মৃতি জাদুঘর ছাড়াও রয়েছে একটি শহীদ মিনার এবং ভাষাশহীদের নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পাঠক–দর্শনার্থী নেই

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা বইয়ে প্রকাশিত তথ্যমতে, ১৯১৯ সালে পাঁচুয়া গ্রামে জন্ম আবদুল জব্বারের। দারিদ্র্যের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়া হয়নি। কৃষিকাজে সাহায্য করতেন বাবাকে। একবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান নারায়ণগঞ্জে। পরে চাকরি সূত্রে যান মিয়ানমারে (তৎকালীন বার্মা)। সেখানে ১০-১২ বছর থেকে গ্রামে ফিরে বিয়ে করেন। ১৯৫২ সালে ক্যানসার আক্রান্ত শাশুড়িকে নিয়ে ভর্তি করান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের সামনে ছাত্র-জনতার সমাবেশে তিনিও যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হন। সেদিন রাতে ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যু হয় তাঁর।

এই ভাষাশহীদের স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত গ্রন্থাগারে ইতিহাস, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, দর্শন, সাহিত্য, ধর্ম, কবিতা, উপন্যাস ও গল্প ছাড়াও বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে অসংখ্য বই দেখা যায়। জাদুঘরের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। গ্রন্থাগারের ভেতরে একটি দেয়ালে আবদুল জব্বারের মৃত্যুর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শ্বেতপাথরে লেখা রয়েছে। বাইরের দেয়ালে রয়েছে আবদুল জব্বারের একটি ছবি।

জাদুঘরে কথা হলো তোফায়েল আহমেদ নামের স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে ভাষাশহীদের একটি ছবি ছাড়া ব্যবহৃত কোনো স্মৃতি কিছু নেই। এটি নামেই স্মৃতি জাদুঘর, কিন্তু কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই।

ভাষাসৈনিক আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম হাবিবুর রহমান বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় মানুষ আসে কম। স্থানীয় লোকজন বলছেন, শুক্র ও শনিবার জাদুঘর ও পাঠাগার বন্ধ থাকে। অথচ ছুটির দিনে কেউ কেউ বেড়াতে এলেও জাদুঘরে ঢুকতে পারেন না।

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ভাষাসৈনিক আবদুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। গতকাল সকালে

ফেব্রুয়ারি এলেই ‘খবর নেয় মানুষ’

জাদুঘর এলাকায় কথা হলো আবদুল জব্বারের চাচাতো ভাই জয়নাল সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই লোকজন আসে খোঁজখবর নিতে। ছুটির দিন ছাড়া তেমন কেউ আসেন না। শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকায় গ্রন্থাগারের ভেতরে দেখতে পারে না। যদি সব সময় দেখতে পারত, একটি মিলনায়তন থাকত, তখন মানুষ আসত। আবার আবদুল জব্বারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র থাকলে মানুষ আকৃষ্ট হতো।

এখানে সারা বছর দর্শনার্থী বাড়াতে সরকারিভাবে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষক হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, একটি মিনি পার্ক, মঞ্চ, কারিগরি কলেজ গড়ে উঠলে লোকসমাগম বাড়বে।

গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বই, তথ্যচিত্র দিয়ে জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্লিপার, দোলনা, ব্যালান্স, রিং স্থাপন করা হয়েছে। শহীদ মিনারটি পুনর্নির্মাণ ও একটি স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণে পরিকল্পনাও রয়েছে।

নেই আবদুল জব্বারের পরিবারের কেউ

ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার মিয়ানমার থেকে ফেরার আগেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। দেশে ফিরে আবদুল জব্বার যোগ দেন ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীতে। একই গ্রামের আমেনা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবদুল জব্বার ও আমেনা খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান নুরুল ইসলাম বাদলের জন্মের কিছুদিন পরই শুরু হয় ভাষা আন্দোলন।

আবদুল জব্বারের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে চলে যায়। তাঁর ছেলে নুরুল ইসলামও ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নুরুল ইসলাম ভারতে পালিয়ে যান ও গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

আবদুল জব্বারের ভাতিজা আতিক উল্লাহ জানান, হালুয়াঘাটের শিমুলকুচি গ্রামে শায়িত আছেন আবদুল জব্বারের মা সাফাতুন্নেসা, স্ত্রী আমেনা খাতুন, একমাত্র সন্তান নুরুল ইসলাম ও আবদুল জব্বারের চার ভাই। শিমুলকুচি গ্রামে আবদুল জব্বারের নামে একটি স্কুল ও কলেজ, একটি জামে মসজিদ, একটি ফাউন্ডেশন রয়েছে।

একুশের কর্মসূচি

শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন আবদুল জব্বার পাঠাগার ও স্মৃতি জাদুঘর বন্ধ থাকে। তবে গতকাল একুশের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি দেখতে এসেছিলেন গ্রন্থাগারিক মো. কায়সারুজ্জামান। জাদুঘরের আশপাশ ও শহীদ মিনার এলাকা পরিষ্কার করছিলেন কয়েকজন নারী। কাজটি তত্ত্বাবধান করছিলেন ভাষাসৈনিক আবদুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান। জাদুঘরের সামনেই তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। ভাষাশহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে উপজেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান হবে এ চত্বরেই।