অসদুপায় অবলম্বন করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগে আটক দুই চাকরিপ্রত্যাশী। রোববার সন্ধ্যায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে
অসদুপায় অবলম্বন করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগে আটক দুই চাকরিপ্রত্যাশী। রোববার সন্ধ্যায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ

‘জালিয়াতি করে’ লিখিততে উত্তীর্ণ, মৌখিক পরীক্ষায় এসে ধরা ১১ প্রার্থী

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন গোলাম রাফসানী। কিন্তু লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে থাকা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলেন না তিনি। এতে সন্দেহ হয় ভাইভা বোর্ডের। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। অবশেষে ভাইভা বোর্ডের কাছে নিজে লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর হয়ে লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন ফয়সাল আহমেদ নামের একজন।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। গত ২৮ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এর আগে ৯ জানুয়ারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেটির ফল প্রকাশিত হয় ২১ জানুয়ারি। জেলায় মোট ২ হাজার ৫০০ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। রোববার চারটি ভাইভা বোর্ডে ৪০০ জনের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গোলাম রাফসানী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়নের ডুগডুগী বাজার এলাকার বাসিন্দা। তাঁর মতো মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসে একই অভিযোগে আটক হয়েছেন আরও ১০ জন। তবে প্রত্যেককেই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, রোববার মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিখিত পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের বিষয়টি স্বীকার করেন অপর চাকরিপ্রত্যাশী মানস চন্দ্র রায়। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরের বিরল উপজেলায়। লিখিত পরীক্ষায় ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মানিরুল ইসলাম রুবেল নামের এক ব্যক্তি তাঁকে ডিভাইস সরবরাহ করেছিলেন।

রোববার দুপুরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) হাবিবুল হাসানের বোর্ডে মৌখিক পরীক্ষা দিতে যান গোলাম রাফসানী। তিনিসহ ভাইভা বোর্ডে তিনজন ছিলেন। গোলাম রাফসানী তাঁদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় সন্দেহের উদ্রেক হয়। তারপরই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদে নিজের অপকর্মের কথা স্বীকার করেন তিনি।

গোলাম রাফসানীর বরাত দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুল হাসান বলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারছিলেন না তিনি। অথচ লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকেই তাঁকে প্রশ্ন করা হচ্ছিল। পরে নিজে পরীক্ষা না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি একটি চক্রের খপ্পরে পড়েছিলেন। চাকরি চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে চক্রটির মোট ১০ লাখ টাকা চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ৫০ হাজার টাকা তাঁর কাছে হাতিয়ে নিয়েছে চক্রের সদস্যরা। আশরাফুল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই লেনদেন হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমরা পুরো চক্রকে ধরার চেষ্টা করছি।’

হাবিবুল হাসান আরও বলেন, এর আগে ৯ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষা দিতে এসে প্রক্সি ও ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট ১৮ জন চাকরিপ্রত্যাশীকে তাঁরা হাতেনাতে ধরেন। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মূলত তিন মাসের বেশি সময় ধরে চক্রটিকে ধরতে প্রশাসন ও পুলিশের সদস্যরা কাজ করছেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের সময়ও সর্বোচ্চ সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। এতে রোববার অনেকে মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েই ফিরে গেছেন। তাঁদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে এ ঘটনার পর থেকে চক্রের সদস্যদের ধরতে মাঠে কাজ করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যদের একটি ইউনিট। এরই মধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। এ বিষয়ে দিনাজপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কয়েকজনের নাম জানতে পেরেছি। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কয়েকজন কর্মচারীসহ কয়েকজন শিক্ষকও জড়িত। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত ঘৃণিত ও ন্যক্কারজনক। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। চূড়ান্তভাবে অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।