
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের একটি কক্ষে হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি রেখে নিখোঁজ হয়েছেন মোহাইমিনুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী। তাঁকে খুঁজে পেতে সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে চিঠিতে বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে লেখা অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মোহাইমিনুল ইসলাম ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম ব্যাচের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে থাকেন। গতকাল রোববার বিকেলে তাঁকে হলটির সামনে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাগামী একটি বাসে উঠতে দেখা যায়। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মোহাইমিনুল ইসলাম রোববার বেলা ৩টা ৮ মিনিটে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে থেকে ঢাকাগামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআরটিসি বাসে ওঠেন। পরে তাঁর আবাসিক কক্ষে চিঠি পাওয়া যায়। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কক্ষে পাওয়া চিঠিতে বিভাগের অবহেলার বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মোহাইমিনুলের কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোহাইমিনুলসহ চার শিক্ষার্থী স্নাতক চতুর্থ বর্ষের একটি কোর্সে অকৃতকার্য হন। পরে তাঁরা ওই কোর্সের বিশেষ পরীক্ষা (স্পেশাল) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি গত ছয় মাস ধরে তাঁরা স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) ক্লাসও করছিলেন।
সহপাঠীদের ভাষ্য, অকৃতকার্য কোর্সটির বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন। তবে কয়েক দিন আগে বিভাগের শিক্ষকেরা জানান, তাঁদের বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং আগামী ২৮ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী ব্যাচের সঙ্গে চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষায় তাঁদের অংশ নিতে হবে। বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের জন্য বিভাগের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই।
মোহাইমিনুলসহ চার শিক্ষার্থী স্নাতক চতুর্থ বর্ষের একটি কোর্সে অকৃতকার্য হন। পরে তাঁরা ওই কোর্সের বিশেষ পরীক্ষা (স্পেশাল) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি গত ছয় মাস ধরে তাঁরা স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) ক্লাসও করছিলেন।
ওই শিক্ষার্থীদের আবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম প্রথম আলোকে বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছিল, বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিতে কারও ২০ হাজার, কারও ৫২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। তাঁরা এত টাকা খরচ করে বিশেষ পরীক্ষা দেবেন, নাকি পরবর্তী ব্যাচের সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা দেবেন, সে বিষয়ে তাঁদের চিন্তা করতে বলা হয়। এর মধ্যে গতকাল মোহাইমিনুলের এমন ঘটনা সামনে এল।
সহপাঠীদের দাবি, কক্ষে পাওয়া চিঠিগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, শিক্ষক ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে হতাশার কথা লেখা আছে। চিঠিতে বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. আব্দুল হালিম বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই সাভার থানায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশকে তাঁর মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তাঁকে খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ ঘটনার পর আট দফা দাবি জানিয়েছেন ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এসব দাবিতে বিভাগের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। গতকাল রাত দুইটার দিকে বিভাগের ফটকে তালা দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে মোহাইমিনুলকে খুঁজে বের করা, তাঁর অকৃতকার্য হওয়া কোর্সের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন, শিক্ষকদের অবহেলার অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন, বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম ও শিক্ষার্থী কল্যাণ উপদেষ্টা আবু সাদাত মো. সায়েমের পদত্যাগ, নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষার্থী বা ব্যাচকে লক্ষ্য করে হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করা।
এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের সময় ক্যাম্পাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ছাত্র সংসদ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর দাবিও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা যেন তাঁরা উপলব্ধি করেন, সে জন্যই তালা দেওয়া হয়েছে। মোহাইমিনুলকে খুঁজে পাওয়া এবং আমাদের আট দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই তালা খোলা হবে না।মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী
আজ সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভাগের প্রতিটি ফটকে তালা ঝুলছে। ফটকের সামনে বিভাগের একজন কর্মকর্তা অপেক্ষা করছেন।
বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা যেন তাঁরা উপলব্ধি করেন, সে জন্যই তালা দেওয়া হয়েছে। মোহাইমিনুলকে খুঁজে পাওয়া এবং আমাদের আট দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই তালা খোলা হবে না।