গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের ওষুধ উৎপাদন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায়
গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের ওষুধ উৎপাদন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায়

টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় আগুন

‘মনে হইছিল আজকাই আমি শেষ, হয়তো বেঁচে ফিরতে পারমু না’

তখন সকাল পৌনে ১০টা। অন্যান্য দিনের মতো কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছিলেন। হঠাৎ শ্রমিকদের চিৎকার শুরু হয়। এদিকে-ওদিক ছুটতে থাকেন শ্রমিকেরা। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের কালো ধোঁয়ায় চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলী এলাকায় ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইউনিট-২-এ আগুন লাগার ঘটনা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে এমন বর্ণনা পাওয়া গেছে।

আজ বুধবার সকালে কারখানার ইউনিট-২-এ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রায় চার ঘণ্টা ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও বিজেবির সদস্যরা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

কারখানাটির চতুর্থ তলায় কাজ করছিলেন শ্রমিক রুমা আক্তার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দিনের মতো আজ সকালে কাজে যোগ দিই। হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখি। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া আমাদের ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আমি ও অন্য শ্রমিকেরা দৌড়ে নিচে নেমে আসি। নিচে নামার সময় আমাদের এক সহকর্মী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকেও উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।’

আগুনের ধোঁয়া যখন ছড়াইয়া পড়ল, মনে হইছিল আজকাই আমি শেষ, হয়তো বেঁচে ফিরতে পারমু না। চারদিকে সব অন্ধকার হইয়া গেছিল। আগুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া করতেছিল। কেমনে যে বাইর হইলাম, আল্লাহই জানে।
আফরোজা বেগম, শ্রমিক

কারখানাটিতে যখন আগুন লাগে, তখন এদিক-ওদিক শ্রমিকেরা ছুটতে থাকেন। আগুনের ধোঁয়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে নিচে সরে আসতে শুরু করেন তাঁরা। এতে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কারখানাটি কর্মরত শ্রমিক আফরোজা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগুনের ধোঁয়া যখন ছড়াইয়া পড়ল, মনে হইছিল আজকাই আমি শেষ, হয়তো বেঁচে ফিরতে পারমু না। চারদিকে সব অন্ধকার হইয়া গেছিল। আগুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালাপোড়া করতেছিল। কেমনে যে বাইর হইলাম, আল্লাহই জানে।’

অনেকটা একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কারখানাটির ট্যাবলেট সেকশনের শ্রমিক মুসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার পেছনে দুজন এবং আমার সামনে দুজন কাজ করছিল। হঠাৎ করেই পেছন থেকে একজন চিৎকার দিয়ে বলে যে আগুন। তখন আমরা চার–পাঁচজন বের হয়ে যাই। কারখানা থেকে বের হয়ে দেখি, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’

আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে ফায়ারসার্ভিসের সঙ্গে যোগ দেয় সেনাবাহিনী একটি দল

ফায়ার সার্ভিস ও কারখানার শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, কারখানায় লাগা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে। আগুনের শিখা ও ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার ভেতরে থাকা ওষুধ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন মালামাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট কাজ শুরু করে। পরে আরও চারটি ইউনিট যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরাসহ আশপাশের ফায়ার সার্ভিসের মোট ২১টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। পরে বেলা একটার দিকে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দেন। পরে বেলা দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।

টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা শাহিন আলম জানান, আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনায় বিভিন্ন স্টেশনের কর্মীরা সম্মিলিতভাবে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালান। কারখানার ভবনটি ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ দ্রুত পুড়ে যাওয়ায় অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।

কারখানার ভেতর থেকে একজনকে বের করে আনছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা

আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ধোঁয়াশা

কারখানার ভেতরে থাকা ওষুধ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ধারণা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে কেমিক্যাল থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামক ওষুধ কারখানার জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় প্রায় ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। হঠাৎ চতুর্থ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে শ্রমিকেরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। পরে জরুরি অ্যালার্ম বাজানো হয়। এরপর কারখানার সব শ্রমিক দ্রুত ও নিরাপদে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। আমাদের কারখানায় কোনো দাহ্যপদার্থ নেই। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।’

আগুন লাগার সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। তিনি বলেন, ‘কারখানার চারতলা ভবনের কেমিক্যাল থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এখন ভেতরে থাকা আগুন ডাম্পিয়ের কাজ চলছে। এই কাজ আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সারা দিন লাগবে। কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছি। তাদের পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’