
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরুদ্দি ইউনিয়নের জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে গতকাল সোমবার ১৮ জন শিক্ষার্থীর আকস্মিক অসুস্থতা ও জ্ঞান হারানোর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হয়েছে। স্কুলসংলগ্ন জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্প্রে করা কড়া কীটনাশকের বিষক্রিয়ার কারণেই অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছিল। আজ মঙ্গলবার সকালে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও মেডিক্যাল টিমের যৌথ তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, গতকাল স্কুলে অবস্থানকালে রোদের উত্তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ ১৮ জন শিক্ষার্থী মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও অস্থিরতা বোধ করে অচেতন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে অচেতন অবস্থায় ১৩ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে রাতে বাড়িতে ফেরত পাঠানে হয়। ওই শিক্ষার্থীরা সবাই আজ বিদ্যালয়ে ফিরেছে। শ্রেণিকক্ষে বসে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে অংশ নিয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন, গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য এবং একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল টিম আজ সকালে জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয় পরিদর্শনে আসে। পরিদর্শনকালে ইউএনও ও তদন্ত দল বিদ্যালয়ের ঠিক পশ্চিম-উত্তর পাশে একটি জমিতে কীটনাশক ছিটানোর তথ্য পায়। বিদ্যালয়ের একেবারে পাশে হওয়ায় জমির কীটনাশকের বিষাক্ত বাষ্প বাতাসে মিশে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। এতেই অচেতন হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
ইউএনও রাসেল ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল ওই জমিতে কৃষক কীটনাশক ছিটিয়েছেন। দুপুরের আগে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। ওই কৃষক তাঁর বাড়িতে থাকা কীটনাশকের বোতলটি এনে তাঁদের দেখিয়েছেন। বোতলের গায়ে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে—এই তরলের তীব্র ঘ্রাণ বা স্পর্শে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, অস্থিরতা ও চেতনা হারানোর মতো প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
তদন্ত দল নিশ্চিত করেছে, বাতাসে ভেসে আসা এই কীটনাশকের বিষাক্ত ঘ্রাণই শিক্ষার্থীদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ও অচেতন হওয়ার মূল কারণ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কীটনাশকের বোতল ও অন্যান্য আলামত জব্দ করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানান ইউএনও।
জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, গতকালের ঘটনায় শিক্ষক ও অভিভাবকেরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তবে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে আসল কারণ উন্মোচিত হওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। আক্রান্ত ১৮ জন শিক্ষার্থী চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছে এবং তারা সবাই আজ ক্লাসে উপস্থিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও মেডিক্যাল টিম এসে নিশ্চিত করেছে যে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ঘ্রাণ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে।’
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা এড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও প্রশাসন থেকে কড়া সতর্কতা ও নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সেটি হলো বিদ্যালয়ের সীমানায় বিদ্যালয় চলাকালে কীটনাশক স্প্রে করা যাবে না। বিদ্যালয়ের আশপাশে কীটনাশক ব্যবহার করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে শুধু শুক্র বা শনিবার (ছুটির দিন) করতে হবে। যেকোনো কড়া কীটনাশক প্রয়োগের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্ষতিকারক প্রভাব নেই মর্মে প্রত্যয়ন বা অনুমতিপত্র নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, গতকাল দুপুরের দিকে উপজেলার তমরুদ্দি ইউনিয়নের জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ের বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ ১৮ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে অচেতন অবস্থায় ১৩ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর বিষয়টিকে গণহিস্টিরিয়া বা গণমনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা বলে সন্দেহ করেছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শেখ মাহমুদুর রহমান। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গতকাল রাতে ভর্তি হওয়া ১৩ জন শিক্ষার্থীর সবাই বাড়ি ফিরে গেছে।