মা–বাবার সঙ্গে চারবার ভারতে গেছে ছোট্ট ইসরাত জাহান। সেখানে ইসরাতের সময় কাটে না। বাবা রংপেনসিল কিনে দেন। বাবা চিকিৎসা নেন আর ইসরাত বসে বসে ছবি আঁকে। ক্যানভাসে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের প্রকৃতি, স্মৃতিসৌধ। তার সেই ছবিগুলো এখনো আছে; কিন্তু বাবা নেই।
ইসরাতের ক্যানসারে আক্রান্ত বাবা এসারুল ইসলামকে দীর্ঘ চিকিৎসার পরও বাঁচানো যায়নি। শুধু বাবাই নয়, ছয় বছরে ইসরাতদের পরিবারের চার সদস্য ক্যানসারে মারা গেছেন। এখন তার মা ও বড় চাচা এই রোগের সঙ্গে লড়ছেন। মা মোসা. ঝরনার ব্রেন ক্যানসার ফোর্থ স্টেজে (চতুর্থ পর্যায়) আর চাচার কোলন ক্যানসার একই স্টেজে।
এই পরিবারের বসবাস রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আতানারায়ণপুর গ্রামে। পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ইসরাত জাহানের পাঁচ বছর বয়সী ছোট এক ভাই রয়েছে। তার নাম জুনায়েদ ইসলাম। ইসরাত এখনো বুঝতে পারছে না তার মায়ের কখন কী হবে। অবশ্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শিশু দুটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এরই মধ্যে রাজশাহী শহরের ‘এসওএস’ শিশু পল্লিতে কথা বলে রেখেছেন।
ছয় বছরে চার মৃত্যু, আক্রান্ত আরও দুজন
এসারুল ইসলামেরা পাঁচ ভাই ছিলেন। মেজ ভাই সাদরুল ইসলাম ২০১৯ সালের দিকে লিভার ক্যানসারে মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৪৬ বছর। এরপর ২০২২ সালে এসারুলের বাবা আবদুল হামিদ মারা যান। ৮০ বছর বয়সে মৃত্যু হলেও তাঁর লিভার ক্যানসার ধরা পড়েছিল। ২০২৪ সালে লিভার ক্যানসারে মারা যান সেজ ভাই মামুন অর রশিদ। তারও বয়স প্রায় ৪০ বছর। এক বছর দুই মাস আগে মারা যান এসারুল ইসলাম। তারও বয়স ৪০ বছর হয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। বছরে যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন। আর ক্যানসারে দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছে ৩১৯ জন।
এসারুলের মৃত্যুর এক মাস পরেই তাঁর স্ত্রী মোসা. ঝরনার ব্রেন ক্যানসার ধরা পড়ে। এ ছাড়া ২০২২ সালের দিকে ইসরাতের বড় চাচা শফিকুল ইসলামের কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। তিনি স্থানীয় একটি হাইস্কুলের শিক্ষক। তার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন।
জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের চিকিৎসা চলে দীর্ঘদিন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষের পক্ষে চিকিৎসা শেষ করে আরোগ্য লাভ করা কঠিন। রোগের প্রকোপের তুলনায় দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৮৫টি দেশের ক্যানসার পরিস্থিতির অনুমিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেখানে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান আছে। প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। বছরে যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন। আর ক্যানসারে দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছে ৩১৯ জন। এক বছরের হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। মৃত্যুও দেখা যায় পুরুষের বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি করে ক্যানসার সেন্টার থাকা দরকার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। মানসম্পন্ন চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা দরকার; কিন্তু আছে মাত্র ২২টি। এর সিংহভাগই রাজধানী ঢাকায়।
ক্যানসারে বিপর্যস্ত পরিবারটি
এসারুল ইসলাম উপজেলার মোহনপুর মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এমবিএ করার পর প্রথম জীবনে ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছিলেন। ২০১১ সালে ঝরনার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঝরনার বাবার বাড়ি গাজীপুরে। তাঁরা প্রথমে ঢাকায় ও পরে মোহনপুর উপজেলা সদরে বাসা নিয়ে থাকতেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তাঁদের জীবনটা একেবারে উল্টে গেছে।
ইসরাতের মা ঝরনাকে এখন নিয়মিত কেমোথেরাপি দিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে স্ট্রোক করে তাঁর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে গেছে। ঢাকায় ব্রেনে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এরপর থেকে কিছু ঠিকমতো মনে রাখতে পারেন না। কিছু বলতে গেলেই আটকে যান। তাঁর শাশুড়ি বেঁচে আছেন; কিন্তু মেয়ের বাড়িতে থাকেন। ফলে তাঁদের দেখাশোনা করার মতো বাড়িতে আর কেউ নেই।
ইসরাতের অন্য চাচারা পৃথক বাড়ি করেছেন। মামুন অর রশিদ এই বাড়িতে থাকতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়েছে। তাঁর দুটি ছোট বাচ্চা ছিল। একটি মায়ের সঙ্গে, আরেকটি নানির সঙ্গে থাকে। মামুনের পাকা ঘরটি এখন খালি পড়ে রয়েছে।
এসারুলের চিকিৎসার জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় আট লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। সেই ঋণের এখনো পাঁচ লাখ টাকা তাঁর পরিবারের ঘাড়ে রয়েছে। ইসরাতের মা ঝরনা বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন; কিন্তু সেই টাকা ব্যাংক তাঁদের দিচ্ছে না। অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে রেখেছে। এখন বাড়ির ভিটা ছাড়া তাঁদের আর কোনো সম্পত্তি নেই। কীভাবে চিকিৎসা হবে, কীভাবে তার দুই সন্তান বেঁচে থাকবে, তার কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) মুঠোফোন বিক্রি করে তিন মাসের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন।
মুখে কোনো হাসি নেই ইসরাতের
ইসরাত জাহানের দাদার পরিবারটি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও বড় একটি পরিবার। গত বুধবার (১২ আগস্ট) ইসরাত জাহানদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে বিশাল একটি মাটির দোতলা, অন্য পাশগুলোতে ইটের ঘর দিয়ে ঘেরা। মাঝখানে বড় উঠান। মাটির দোতলার দরজা আর খোলা হয় না। ফুটবল মাঠের মতো উঠানটায় শেওলা জমেছে। দুটি শিশু ছাড়া অত বড় উঠানে পা ফেলার কেউ নেই। ছোট্ট জুনায়েদ চটপটে। মা ঝরনা বললেন, ও রান্নার জন্য তরকারি কাটে। রান্না করে। সব পারে; আর ইসরাত চুপচাপ থাকে। তার কাছ থেকে সরতে চায় না।
ভারতে হাসপাতালে বসে বসে আঁকা ছবিগুলো বের করে দেখাল ইসরাত। অ্যালবামে বাবার সঙ্গে তোলা ছবি দেখাল; কিন্তু মেয়েটার মুখে কোনো হাসি নেই। সব সময় মনমরা। সব দেখে মনে হলো, এক বছরের ব্যবধানে একটি রাজকন্যা ‘রাজ্যহীন’ হয়ে গেছে।
ইসরাত জাহানের পড়াশোনার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ। কোথাও একটুকরা কাগজ পেলেই তুলে পড়তে শুরু করে। দেয়ালে কোনো লেখা দেখলেই সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। উপজেলা সদরে থাকতে পড়াশোনাসহ সব প্রতিযোগিতায় প্রথম হতো। এখনো পড়াশোনার জন্য ঢাকায় যেতে চায়।
মাসখানেক আগের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাঁর মা ঝরনা বলেন, বড় চাচা শফিকুলের স্ত্রী শাবানা বেগমের কাছে ঢাকায় যাওয়ার জন্য টাকা চেয়েছিল ইসরাত। কী মনে করে শাবানা ওর হাতে ৮০০ টাকা দিয়েছেন। ইসরাত কাউকে কিছু না বলে বই-খাতা নিয়ে ঢাকায় যেতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। মোহনপুর বাস টার্মিনালের এক কন্ডাক্টর বুঝতে পেরে তার মাকে ফোন দিয়েছেন। মা এসে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।
সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইসরাতের বাবাদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এখন আনোয়ার হোসেন ভালো আছেন। তাঁর বয়স ৩৮ বছর চলছে। তিনি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বাইরে থাকেন। তিনিও হেপাটাইটিস বি পজিটিভ। যোগাযোগ করা হলে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিয়মিত ওষুধ খান। এভাবেই এখনো সুস্থ আছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের মতো ক্যানসারের ভুক্তভোগী একটি পরিবার কুমিল্লায় আছে বলে শুনেছেন। এ ধরনের পরিবারের দিকে সরকারের নজর দেওয়া দরকার। ওষুধগুলো ছাড়ে অথবা বিনা মূল্যে দেওয়া উচিত।
মোহনপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী ফেরদৌসী হক নিয়মিত পরিবারটির খোঁজ রাখেন। কোথাও কোনো সুযোগ–সুবিধার খবর পেলেই তাঁদের নিয়ে যান।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হোসেন শামীম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ইসরাতদের পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকার একটা অনুদান দিয়েছেন। রোগী কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে কিছু ওষুধ দেন। তবে যা সাহায্য করেন, তা দিয়ে তাঁদের কিছু হয় না। মোসা. ঝরনা যেকোনো সময় মারা যাবেন। বাচ্চা দুটিকে রাখার জন্য ইতিমধ্যে তাঁরা রাজশাহী শহরের এসওএস শিশু পল্লীর সঙ্গে কথা বলে রেখেছেন।