কুমিল্লা নগরের একটি গলিতে সাদাপোশাকে দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করাকে কেন্দ্র করে পুলিশের দুই সদস্য ও তাঁদের এক সোর্সকে ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধর করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্পাসে তোলা
কুমিল্লা নগরের একটি গলিতে সাদাপোশাকে দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করাকে কেন্দ্র করে পুলিশের দুই সদস্য ও তাঁদের এক সোর্সকে ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধর করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্পাসে তোলা

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে সাদাপোশাকে পুলিশের তল্লাশি, এরপর যা ঘটল

কুমিল্লা নগরের একটি গলিতে দুই তরুণকে তল্লাশি করেন সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের দুই সদস্য ও তাঁদের একজন সোর্স। এ সময় তরুণেরা নিজেদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেন। তল্লাশি শেষে ওই তিনজনের পরিচয়পত্র দেখতে চান শিক্ষার্থীরা। কিন্তু পরিচয়পত্র দেখাতে না পারায় তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে যান শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে নগরের পুলিশ লাইনস-সংলগ্ন রেসকোর্স এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টির সমাধান করা হয়।

ওই তিনজনের একজন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শ্যামল সাহা। অপর দুজনের একজন একই থানার কনস্টেবল হানিফ এবং অন্যজন পুলিশের সোর্স জাহিদ।

পুলিশের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং চলমান কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তাঁরা সাদাপোশাকে টহল দিচ্ছিলেন। এ সময় সন্দেহভাজন মনে হওয়ায় দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশি করা হয়। পরে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিলে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সেখানে আরও শিক্ষার্থী উপস্থিত হন। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ না দিয়ে জোর করে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মারধর করা হয়।

পুলিশ সদস্যসহ তিনজনকে ক্যাম্পাসে নেওয়া হলে অনেক শিক্ষার্থী জড়ো হন

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি, তিনজনই নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিলেও পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। এ কারণে তাঁদের ছিনতাইকারী বলে সন্দেহ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সিফাত হোসেন ও তানভীর আলম জানান, তাঁরা টিউশন শেষে নগরের রেসকোর্স এলাকার একটি গলি দিয়ে ফিরছিলেন। পথে পুলিশ পরিচয়ে দুই ব্যক্তি তাঁদের গতিরোধ করেন। তল্লাশির নামে তাঁদের পকেটে হাত দেওয়া হয়। পরিচয় জানতে চাইলে তাঁদের একজন পুলিশ পরিচয় দিয়ে এক শিক্ষার্থীর শার্টের কলার ধরেন। তল্লাশিতে কিছু না পেয়ে তাঁরা চলে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখতে চান। তখন তাঁরা পুলিশ পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ দেখান। তবে পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি।

সিফাত হোসেন বলেন, পরিচয় দেওয়ার পরপরই ওই তিনজনের একজন পকেটে হাত দেন। এভাবে সরাসরি কারও পকেটে হাত দেওয়ার অধিকার তাঁদের নেই। কারণ, এভাবে তল্লাশির সময় কারও পকেটে কিছু ঢুকিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গামী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বাসে ওই তিনজনকে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন তাঁরা। এ সময় বাসে থাকা ও ক্যাম্পাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তাঁদের কয়েক দফা মারধর করেন। পরে তাঁদের প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়।

ওই শিক্ষার্থীরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং দুঃখ প্রকাশ করা হয় বলে দাবি করেছেন ঘটনাস্থলে থাকা এএসআই শ্যামল সাহা। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ দেখান। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তা না করে তাঁদের জোর করে টেনে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা ওয়াকিটকি ও হ্যান্ডকাফ দেখান। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তা না করে তাঁদের জোর করে টেনে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শ্যামল সাহা, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এএসআই

পুলিশ ও প্রক্টরের বক্তব্য

প্রক্টর অফিসে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, ওই তিনজনের মধ্যে দুজন কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ সদস্য এবং অন্যজন পুলিশের সোর্স।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে জানিয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, এ অভিযানে অনেক পুলিশ সদস্য সাদাপোশাকে কাজ করেন। গতকাল যা ঘটেছে, তা শিক্ষার্থীরা থানায় ফোন করে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারতেন। কিন্তু তা না করে পুলিশ সদস্যদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থলে শিক্ষার্থীরা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা থানায়, এমনকি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলেও বিষয়টি সেখানেই সমাধান করা যেত। তাঁরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে
তৌহিদুল আনোয়ার, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি

ওসি তৌহিদুল আনোয়ারের মতে, ঘটনাস্থলে শিক্ষার্থীরা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা থানায়, এমনকি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলেও বিষয়টি সেখানেই সমাধান করা যেত। তাঁরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

গতকাল রাতে নিজ দপ্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহাদাৎ হোসেন বলেন, দুই পক্ষেরই কিছু ভুলত্রুটি ছিল। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তাঁদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদস্যদের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষ বিষয়টি মেনে নিয়েছে।