দিঘির শহর হিসেবেও একসময় পরিচিতি ছিল কুমিল্লার। এখন ধর্মসাগর ছাড়া এই শহরে বড় কোনো দিঘি বা জলাধার নেই
দিঘির শহর হিসেবেও একসময় পরিচিতি ছিল কুমিল্লার। এখন ধর্মসাগর ছাড়া এই শহরে বড় কোনো দিঘি বা জলাধার নেই

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন

কুমিল্লা শহরকে ‘বাঁচানোর’ সুযোগ

দুই-তিন দশক আগেও কুমিল্লা অনেকটাই সাজানো-গোছানো শহর ছিল। মানুষের প্রত্যাশা, এই শহর বাঁচাতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কার্যকর ভূমিকা নেবে।

সরু সড়ক, অপর্যাপ্ত ফুটপাত, যানজট আর জলাবদ্ধতার সঙ্গে উন্মুক্ত স্থান ও জলাধার কমে যাওয়া—কুমিল্লা শহরে নাগরিক দুর্ভোগের এমন তালিকা চাইলে আরও দীর্ঘ করা যাবে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন এবং শহরের চারপাশে পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে ওঠা নতুন বসতি। 

২০১১ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে কুমিল্লায় একদিকে জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের স্থাপনা-অবকাঠোমো তৈরি হয়েছে। শহরের ভবিষ্যৎ নিয়েই যখন বড় প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে সরকার। এই কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্য জনদাবি ছিল। এখন মানুষের প্রত্যাশা, শহর বাঁচাতে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কার্যকর ভূমিকা নেবে।

কুমিল্লার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা মা ও শিশুকল্যাণ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক দিলনাশি মোহসেন প্রথম আলোকে বলেন, দুই-তিন দশক আগেও অনেকটাই সাজানো-গোছানো শহর ছিল। তখন এত উঁচু ভবন ছিল না। গত কয়েক বছরে শহরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অটোরিকশা বেড়েছে। যানজটের কারণে শহরে চলাচল করার মতো পরিস্থিতি নেই। 

বর্ষায় শহরে জলাবদ্ধতা হবে, এটি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে কুমিল্লার বাসিন্দা দিলনাশি মোহসেন বলেন, বাসাবাড়িও এখন পানিতে তলিয়ে যায়। অন্যদিকে গরমের সময় রাস্তায় বের হলেই মানুষকে ধুলার যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হয়। যেভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে, এখন থেকেই সেটিকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কুমিল্লা বাসযোগ্যতা হারাবে।

কুমিল্লার আরেক বাসিন্দা সৈয়দ রাহিল আহমেদ বলেন, ‘আমরা চাই, এখন থেকেই পরিকল্পনা করা হোক যাতে কুমিল্লাকে একটি বাসযোগ্য শহরে পরিণত করা যায়। না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম এখানে বসবাস করতে অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।’

 এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন পাস হয়েছে গত ১০ এপ্রিল। আইন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের কাজ শুধু ভবন নির্মাণ অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মহাপরিকল্পনা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন। এ ছাড়া অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণ আনা, জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণ, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাও এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

শুধু ভবনের নকশা অনুমোদন নয়

কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে দৃশ্যমান কাজ হবে যত্রতত্র ভবন নির্মাণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা। আইনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত এলাকায় ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রচলিত ভবন নির্মাণ আইন, বিধিমালা ও কোড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকি করা। ঝুঁকিপূর্ণ, অবৈধ, অননুমোদিত বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটানো স্থাপনা অপসারণের ক্ষমতাও আইনে এই কর্তৃপক্ষের দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে গত ১১ জুন দায়িত্ব নেন উদবাতুল বারী (আবু)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জমির মালিকানা থাকলেই ইচ্ছেমতো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। ভবন নির্মাণে নিয়মনীতি মানতে হবে।

আইনে কর্তৃপক্ষের সেবার ডিজিটালাইজেশনের কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে আশা করা যায় ভবিষ্যতে আবেদন, নকশা যাচাই, ভূমির তথ্য সংরক্ষণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেবে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

দিনের বেশির ভাগ সময় যানজট লেগে থাকে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকায়। গতকাল বিকেলে তোলা

ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

কুমিল্লার নগরকে বাসযোগ্য রাখতে ভূমির ব্যবহারের বিষয়টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় শিল্প, কোথায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, কোথায় পার্ক-খেলার মাঠ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান থাকবে—তা নির্ধারণ না করে শহর সম্প্রসারণ হলে বর্তমান সংকট আরও বাড়বে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ‘যেখানে জমি আছে, সেখানেই ভবন’—এই প্রবণতার পরিবর্তে কোন জমির জন্য কোন ব্যবহার উপযুক্ত, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক স্থাপনা, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন এবং জলাধারে স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনার কার্যকর প্রয়োগ থাকতে হবে।

কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত, বস্তিবাসী ও গৃহহীন মানুষের আবাসন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মহাপরিকল্পনার আলোকে আবাসনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বও রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

তাই ভবিষ্যতের আবাসন পরিকল্পনায় শুধু বহুতল ভবন বা বেসরকারি আবাসিক প্রকল্প নয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন, পুনর্বাসন এবং পুরোনো অপরিকল্পিত এলাকার পুনঃ উন্নয়নের বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

জলাধার ও কৃষিজমি থাকবে পরিকল্পনায়

কুমিল্লার নগর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জলাধার, খাল, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ ও কৃষিজমি সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। আইনেই নগর ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণ, উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনের সুবিধা এবং সবুজ বেষ্টনী তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জলাধার সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই আলাদা কোনো দায়িত্ব নয়; এটি নগর–পরিকল্পনার অংশ। কারণ, একটি এলাকায় জলাধার ভরাট বা পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু ওই জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী বলেন, ‘নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি খাল, পুকুর, ডোবা, প্রাকৃতিক জলাধার ও পানি প্রবাহের পথ ভরাট হয়, তাহলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে।’

পুরোনো শহরে নতুন পরিকল্পনা

কুমিল্লার পুরোনো শহরের অনেক এলাকায় রাস্তা সরু, ভবন পুরোনো, পার্কিংয়ের জায়গা কম এবং নাগরিক সুবিধা সীমিত। এসব এলাকায় শুধু নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হলে বিদ্যমান চাপ আরও বাড়বে।

এ কারণে আইনে ভূমি পুনঃ উন্নয়ন ও ভূমি পুনর্বিন্যাসের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভূমি পুনঃ উন্নয়নের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ, জরাজীর্ণ ও অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার এলাকার পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। আর ভূমি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে একাধিক খণ্ডিত জমি একত্র করে রাস্তা, ড্রেন, পার্ক ও জনসেবার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রেখে পরিকল্পিতভাবে জমি পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, এসব এলাকায় শুধু নতুন ভবন অনুমোদন করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আরবান রিডেভেলপমেন্ট বা শহর পুনঃ উন্নয়নের পরিকল্পনা নিতে হবে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান সীমানার বাইরে এর আশপাশের অনেক এলাকায় নগরায়ণের চাপ ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। কোথাও আবাসিক ভবন, কোথাও বাণিজ্যিক স্থাপনা, আবার কোথাও সড়ক ও নাগরিক সুবিধা ছাড়াই নতুন বসতি গড়ে উঠছে।

কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনের প্রয়োগ শুধু সিটি করপোরেশন এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; সরকার গেজেটের মাধ্যমে চাইলে সিটি করপোরেশন-সংলগ্ন এলাকাও কর্তৃপক্ষের আওতায় আনতে পারবে।

সমন্বয়ই বড় পরীক্ষা

কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের কাজ আলাদা হলেও নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। আইনেও কর্তৃপক্ষের গঠনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য রাখা হয়েছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, ‘দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যই কুমিল্লাকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলা। তাই কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড বা কার্যক্রমে সিটি করপোরেশন সব সময় নিজ অবস্থান থেকে সহায়তা করবে।’

আইনে কর্তৃপক্ষ ও অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার মধ্যে মহাপরিকল্পনা, উন্নয়ন প্রকল্প বা সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রথমে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং সমাধান না হলে সরকারের মাধ্যমে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানও সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ সব সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে বাস্তবে সমন্বয়ের কাঠামো কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষতি রাতারাতি কাটানো সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন করে কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, কোন জমি কোন কাজে ব্যবহার হবে এবং শহর কোন দিকে বাড়বে—এসব বিষয় এখন থেকেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ভবিষ্যতের কুমিল্লা শহর কতটা পরিকল্পিত হবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে শহরটি কতটা বাসযোগ্য হবে।

কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কুমিল্লার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিয়ে আমরা আশাবাদী। আশা করি, এটির কার্যক্রম হবে সুদূরপ্রসারী। এখন থেকে কুমিল্লায় অপরিকল্পিত কোনো কাজ হতে পারবে না—এটাই সবচেয়ে বড় গুণগত পরিবর্তন।’