
কক্সবাজার সদর উপজেলার বাঁকখালী নদীর তীরে খুরুশকুল এলাকার উপকূলের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের সাফল্য পথ দেখাচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে। ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এ কেন্দ্রটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি সফলভাবে চালু হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। গত কয়েক মাসে রেকর্ড বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে কেন্দ্রটি থেকে।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলের উন্মুক্ত জায়গায় স্থাপন করা হয় দেশের বৃহৎ বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প। খুরুশকুল, পোকখালী, পিএমখালী ও চৌফলদণ্ডী—এই চারটি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ২৩টি উঁচু টারবাইন বা বায়ুকল। প্রতিটি টারবাইনের জন্য ২০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার অতিক্রম করলেই এসব টারবাইনে শুরু হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন।
ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট বাড়লে এবং বিশ্ব পরিস্থিতি আরও জটিল হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের দিকেই ঝুঁকছে পুরো বিশ্ব। তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে এই প্রকল্প।—এনামুল হক, সমন্বয়কারী কর্মকর্তা, খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প।
সম্প্রতি খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ প্রকল্পটি দেখতে এসেছেন। বাতাসে টারবাইনগুলো ঘুরছে। আকাশছোঁয়া প্রতিটি টারবাইনের ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার এবং খুঁটির উচ্চতা ৯০ মিটার।
খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বয়কারী কর্মকর্তা এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২০২৩ সালের ২৫ মে থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে শুরু করে। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২৪ সালের ৮ মার্চ। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর থেকে চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছরে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
এনামুল হক আরও বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট বাড়লে এবং বিশ্ব পরিস্থিতি আরও জটিল হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের দিকেই ঝুঁকছে পুরো বিশ্ব। তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে এই প্রকল্প। এর জন্য ডিজেল, পেট্রল, এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ প্রাকৃতিক বাতাস বইছে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ততক্ষণ বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
কেন্দ্রের প্রকৌশলীরা জানান, বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলে টারবাইনগুলো প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। আটজন প্রকৌশলী এই কেন্দ্রের উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
চীনের অর্থায়নে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। ৯০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের সব যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে চীন থেকে। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে কক্সবাজার শহরের ৭০০ বহুতল ভবনে সোলার প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ভবনগুলোর মধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট, গেস্টহাউস-কটেজ এবং বাকিগুলো সরকারি-বেসরকারি দপ্তর। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও হোটেলমালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের সাড়া মিললেও হোটেলমালিকদের মধ্যে অনীহা দেখা গেছে। বেশির ভাগ হোটেল ভবনের ছাদে রেস্তোরাঁ, সুইমিংপুল ও কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা থাকায় সোলার প্যানেল বসানোর পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
এ প্রসঙ্গে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সোলার থেকে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। তবে হোটেল ভবনে নানা অবকাঠামো থাকায় বিকল্প উপায়ের সন্ধান চলছে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার উপকূলে শুধু বায়ুবিদ্যুৎ নয়, সমুদ্রের ঢেউ, পরিত্যক্ত জলাশয় ও লবণমাঠ থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক আবিদ আহসান সাগর বলেন, উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় কক্সবাজারে সমুদ্র থেকে দক্ষিণমুখী বাতাস প্রবাহিত হয় এবং এর গতিবেগও তুলনামূলকভাবে ভালো। পাশাপাশি পাহাড় ও সমুদ্রের সমন্বয়ে এখানে প্রাকৃতিকভাবে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীর মতো বিভিন্ন উপকূলে বায়ুর প্রবাহ বেশ স্থিতিশীল। এসব এলাকার বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ–সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
পর্যটন শহর কক্সবাজারে এখন লাখো পর্যটকের ভিড়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটকসহ শহরের কয়েক লাখ মানুষ রয়েছেন ভোগান্তিতে। কক্সবাজারের খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত এবং মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার পরও পর্যটন শহরটিতে লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের।
শহরের ঝাউতলা এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, গত মঙ্গলবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার দফায় অন্তত তিন ঘণ্টা লোডশেডিং করা হয়েছে। আগে দুপুর ও রাতের বেলায় কয়েক দফায় ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, এখন ভোররাতেও লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে দৈনিক দেড় লাখ পর্যটক অবস্থান করেন। দিন ও রাতের ঘন ঘন লোডশেডিং পর্যটকদের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডিজেল ও অকটেনের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঠিকমতো জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে সাময়িক বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা গেলেও লিফট সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে পিডিবি কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজার শহরে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে দৈনিক কয়েক দফায় ২ থেকে ১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় কক্সবাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও লোডশেডিং করা হয়।