কুমিল্লার দেবীদ্বারে নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারীদের কাছে নিজের শাপলা কলি প্রতীকে ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার জাফরাবাদ এলাকায়
কুমিল্লার দেবীদ্বারে নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারীদের কাছে নিজের শাপলা কলি প্রতীকে ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার জাফরাবাদ এলাকায়

কুমিল্লা-৪ আসন

মাঠে ‘শক্ত’ প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, তবু ঘাম ঝরাচ্ছেন হাসনাত আবদুল্লাহ

কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার বড়কামতা ইউনিয়নের ছোট্ট একটি বাজার বটতলী। বাজারে সাত বছর ধরে চা বিক্রি করেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জীবন চন্দ্র দে। মঙ্গলবার সকালে তাঁর দোকানে ঢুকতেই কানে ভেসে এল ভোটের আলাপ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভোট দিতে যাবেন না?’ উত্তর এল, ‘ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা।’

দুজনের কথোপকথনে বোঝা গেল কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে তেমন নির্বাচনী উত্তাপ নেই। শুধু বটতলী বাজারই নয়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেবীদ্বারের কয়েকটি এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

চা-দোকানি জীবন চন্দ্র দে প্রথম আলোকে বলেন, এ আসনে ভোটে লড়ছেন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে লড়াই করার মতো অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী নেই। বিএনপির একজন থাকলেও বাদ পড়েছেন। এ জন্য ভোটাররা মনে করছেন, হাসনাত খুব সহজে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। এ কারণে আসনে ভোটের উত্তাপ সেভাবে নেই।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করায় নির্বাচন কমিশন তা বাতিল করে। পরে আদালতে আপিল করলেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি তিনি।

এমন অবস্থায় ‘শক্ত’ প্রতিদ্বন্দ্বী নেই হাসনাত আবদুল্লাহর। অনেকে হাসনাতের বিজয়কে ‘সময়ের ব্যাপার’ বলছেন। তবু ভোটের মাঠে ঘাম ঝরাচ্ছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীই দুর্বল নন; সবাইকে তিনি হেভিওয়েট হিসেবে দেখছেন।

গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় উপজেলার মোহনপুর এলাকায় উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেন হাসনাত। সর্বশেষ রাত ৯টায় উপজেলার ছোট আলমপুর এলাকায় উঠান বৈঠকে বক্তৃতা করেন। সারা দিনে মোট ১১টি সভা ও উঠান বৈঠকে অংশ নেন তিনি। বেলা একটার দিকে বড়কামতা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণখাড়া এলাকার বটতলী বাজারে তাঁর নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভার এক ফাঁকেই প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘মাঠে অনেক প্রার্থী আছেন। আমার কাছে প্রত্যেক প্রার্থীই চ্যালেঞ্জিং। জনগণের রায় নিয়েই আমাদের সংসদে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ভোট কিন্তু জনগণের কাছে। আমাদের প্রত্যেক ভোটারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। শুধু একবার নয়, আমার কর্মী-সমর্থকেরা প্রত্যেক ভোটারের কাছে একাধিকবার করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া ভোটের মাঠে যেসব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আছেন, তাঁরাও কিন্তু ঘরে বসে নেই। তাঁরা ভোটারদের কাছে একবার গেলে আমাদের পাঁচবার যেতে হবে।’

নির্বাচিত হলে প্রথমে কোন কাজ করবেন প্রশ্ন করলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে রাস্তাঘাটসহ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে প্রথমে কাজ করব। দেবীদ্বারের অনেক এলাকা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে। এখনো অনেক এলাকায় উচ্চবিদ্যালয় নেই। আমি শিক্ষা খাতে বেশি জোর দেব। মাদক, জুয়া, চাঁদাবাজমুক্ত দেবীদ্বার গড়ব।’

দেবীদ্বারে নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার বড়কামতা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণখাড়া এলাকার বটতলী বাজারে

পরে নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অতীতে যেটা হয়েছে, প্রার্থী ভোটারদের খাইয়েছে, টাকা দিয়েছে। ভোটারদের প্রার্থী ঘুষ দিয়েছে, বাড়িতে সিএনজি-অটোরিকশা পাঠিয়েছে কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। আপনি যখন ভোটের আগেই প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ খাবেন, তাহলে আপনার কি প্রার্থীর ঘুষ ধরার কোনো অধিকার আছে? আপনার হাতে এক দিনের ক্ষমতা ছিল, আপনি সেটির অপব্যবহার করেছেন। সুতরাং আপনার পাঁচ বছর নেতার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার অধিকারও থাকবে না। আমরা চাই, জনগণ তাদের হারিয়ে ফেলা ক্ষমতা এই নির্বাচনে পুনরুদ্ধার করবে।’ তিনি বলেন, ‘ভোট আপনার অধিকার। পায়ে হেঁটে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের অধিকার আপনাকে বুঝে নিতে হবে। আপনি যদি ভোটের আগে আপনার অধিকার বিক্রি করে দেন, তাহলে পাঁচ বছর আপনাকে গোলাম হয়ে থাকতে হবে। একই সঙ্গে আপনাকে আজাদির জন্য গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।’

হাসনাত ছাড়াও এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আবদুল করিম হাতপাখা প্রতীক, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার আপেল প্রতীক এবং গণ অধিকার পরিষদের মো. আ. জসিম উদ্দিন ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেয়ালঘড়ি বরাদ্দ পেলেও ইতিমধ্যে তিনি হাসনাতকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন।

গতকাল দেবীদ্বারের বড়কামতা, ইউসুফপুর, মোহনপুর ও জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহর কিছু নির্বাচনী ব্যানার টানানো দেখা গেছে। তবে অন্য প্রার্থীদের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। বড়কামতা এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকার ভোটাররা বিশ্বাস করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি হাসনাত বিজয়ী হবেন। কারণ, ভোটের মাঠে তাঁর মোকাবিলা করার মতো তেমন কোনো প্রার্থী নেই। তাঁর বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার।