সাগরের বিশাল ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছে তীরে। সৈকতে চেয়ারে বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করছেন কয়েক শ নারী-পুরুষ। আবার অনেকেই দাপাদাপি করছেন সাগরের নোনাজলে। গত শুক্রবার দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা যায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে।
সৈকতে বসে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করা পর্যটকদের একজন আবুল মনজুর (৫০)। তিনি জানান, ঢাকার বাড্ডায় ব্যবসা রয়েছে তাঁর। সেখানেই থাকেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। সাগরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও পর্যটন শহরের সার্বিক চিত্র নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। আবুল মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার। পর্যটনকে ঘিরে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হয়েছে, কিন্তু সেবার মান তেমন বাড়েনি। বিনোদনের ব্যবস্থাও তেমন নেই।
মনজুরের কথা শেষ না হতেই পাশে থাকা স্ত্রী সাদিকা ইয়াসমিন কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ১০ বছর আগে তিনি প্রথম কক্সবাজার ভ্রমণে এসে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন, এখন তার কিছুই নেই। চোখ জুড়িয়ে নীল জলরাশি দেখার জন্য পর্যটকেরা কক্সবাজার ছুটে আসেন। কিন্তু কলাতলী-সুগন্ধা থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতের ভাঙা চেহারা এবং নোংরা পরিবেশ দেখে পর্যটকেরা হতাশ হচ্ছেন।
এখানে কমবেশি সবাই হোটেল রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ, দোকান নির্মাণে ব্যস্ত। কক্সবাজার এখন হোটেলের শহরে পরিণত হয়ে গেছে। বিদেশি পর্যটক টানার কোনো উদ্যোগ নেই। হোটেল ভাড়া, খাবারের দাম, দিন দিন বাড়ছে। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যায়নি।হামিদুর রহমান, পর্যটক
পাশের একটি চেয়ারে বসে ছিলেন রাজশাহীর কলেজশিক্ষক সাইফুর রহমান (৫১)। তিনি বলেন, এই পাঁচ কিলোমিটার সৈকতের পাশে অসংখ্য উঁচু দালান। সৈকতে না এলে সাগর দেখাই যায় না। হোটেল বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা সাগরে মিশে পানি দূষিত হচ্ছে।
ঢাকা থেকে সপরিবার বেড়াতে আসা হামিদুর রহমান (৪৫) নামের আরেক পর্যটক বলেন, ‘এখানে কমবেশি সবাই হোটেল রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ, দোকান নির্মাণে ব্যস্ত। কক্সবাজার এখন হোটেল শহরে পরিণত হয়ে গেছে। বিদেশি পর্যটক টানার কোনো উদ্যোগ নেই। হোটেল ভাড়া, খাবারের দাম, দিন দিন বাড়ছে। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যায়নি।’
কক্সবাজার শহরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের এসব অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল-দূষণে এখন পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে কক্সবাজারের। এসব সমস্যা সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উদ্যোগও অনেকটা দায়সারা।
সাত শতাধিক বহুতল ভবন
কক্সবাজারের সৈকতসংলগ্ন প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে চলেছে বহুতল ভবন। গত তিন দশকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় ৭০০টির বেশি বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। যেসব ভবনের উচ্চতা ৪ থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত। এসব ভবনের মধ্যে আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস রয়েছে ৫৩৭টি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ ভবনের মধ্যে কেবল তারকা মানের ১৪টি ভবনে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) আছে। পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৫টির। বাকিগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ইসিএ এলাকায় আইন লঙ্ঘন করে হোটেল ভবন নির্মাণের অভিযোগে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা হয়েছে। গত এক বছরে ৫১টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ কোটি ১২ লাখ ১৫ হাজার ১৫৮ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। এসটিপি ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া হোটেল-রিসোর্ট পরিচালনা না করতে গত দুই বছরে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ হোটেলে এসটিপি না থাকায় হোটেলের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা সাগরে মিশছে। পৌর এলাকায় ময়লা ফেলার ডাম্পিং স্টেশনও নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০০ ভবনের মধ্যে কেবল তারকা মানের ১৪টি ভবনে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) আছে। পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৫টির। বাকিগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশেও এক দশক ধরে ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। এতে সৈকতসংলগ্ন ঝাউবাগান উজাড় হচ্ছে এবং লাল কাঁকড়া ও মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
বিনোদনের সুযোগ সীমিত
হোটেল মালিক সমিতি ও ট্যুর অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কক্সবাজারে অন্তত ৯০ লাখ পর্যটক এসেছেন। আগের বছর এসেছিলেন প্রায় ৮০ লাখ। চলতি বছরের ৯ মাসে এসেছেন ৫০ লাখের বেশি। হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ১৭টি খাতে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এর মধ্যে হোটেল-রেস্তোরাঁ, শুঁটকি, সামুদ্রিক মাছ, শামুক-ঝিনুকের পণ্যসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে। কিন্তু পর্যটকদের জন্য বিনোদনের সুযোগ সীমিত।
ঢাকা থেকে আসা মাহমুদুর রহমান নামের এক পর্যটক বলেন, দিনে সমুদ্র, পাহাড় ও ঝরনা ঘুরে সময় কাটানো গেলেও রাতে হোটেলের টেলিভিশন দেখা বা মুঠোফোন ব্যবহার করা ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না। শিশুদের জন্য বিনোদন পার্ক, আধুনিক সিনেমা হল, কেব্ল কারের মতো বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই।
গত এক দশকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কক্সবাজারের উন্মুক্ত সৈকতের বিভিন্ন মেলা, ঘুড়ি উৎসব, বিচ কার্নিভ্যাল, সংগীত উৎসব, ক্রীড়া উৎসব, আন্তর্জাতিক সার্ফিং প্রতিযোগিতা এবং বর্ষবরণ ও থার্টিফার্স্ট নাইটের মতো আয়োজন বন্ধ রয়েছে।
হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ১০ কিলোমিটার পরপর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে একই স্থানে পর্যটকের চাপ কমানো যাবে। একই সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।
সাগরে গোসলও নিরাপদ নয়
পর্যটকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সৈকতের ১৭টির বেশি গুপ্তখাল বা আন্ডারওয়াটার কারেন্ট। এতে গোসলের সময় ঝুঁকি বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সি-সেফ লাইফগার্ডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে ২৭ জন লাইফগার্ড কাজ করেন। কিন্তু কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আরও ১১৫ কিলোমিটার সৈকতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই। অথচ দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটোয়ারটেক, বাহারছড়া ও টেকনাফ সৈকতে পর্যটকেরা গোসল করেন।
সি-সেফ লাইফগার্ড সূত্র জানা গেছে, ২০১২ সাল থেকে তারা কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছে। গত ১২ বছরে লাইফগার্ডের কর্মীরা প্রায় দুই হাজার পর্যটককে উদ্ধার করেছেন। একই সময়ে গুপ্তখাল বা স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে নিহত ৮০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গুপ্তখাল থেকে তাৎক্ষণিক উদ্ধারের জন্য কোনো ডুবুরি দলও নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার শাখার সভাপতি অজিত দাশ বলেন, সাগরে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে আধুনিক জলযান, ড্রোন, দুরবিন বা ডুবুরি নেই। পুরো সৈকতে জরুরি চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক বা চিকিৎসাকেন্দ্রও নেই।
বিদেশি পর্যটক কম
চার দশক আগে লাবণী পয়েন্টে বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এখন তাঁদের দেখা মেলে খুব কম। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, বিদেশি পর্যটক সৈকতে এলে অনেক সময় স্থানীয় লোকজন তাঁদের ঘিরে ধরেন, ছবি তোলেন বা পিছু নেন। ফলে বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের কেউ কেউ মূল সৈকত এড়িয়ে যান।
কক্সবাজারের মারমেইড বিচ রিসোর্টে বছরজুড়ে বিচ কার্নিভ্যাল, ক্র্যাব ফেস্টিভ্যাল, থার্টিফার্স্ট নাইট, লোকজ সংস্কৃতি উৎসব, ফুড ফেস্টিভ্যাল, অ্যানিমেল শো, আর্ট গ্যালারি ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ফলে বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই রিসোর্টটিতে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটির অনুসরণে মেরিন ড্রাইভ, ইনানী, কলাতলী ও টেকনাফ সৈকতে গত কয়েক বছরে ৫৫টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।
কক্সবাজারে মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশি পর্যটকেরা প্রকৃতি দেখতে কক্সবাজারে আসেন, কংক্রিটের ভবন দেখতে নয়। তাই প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটন গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, কক্সবাজারে রাত্রিকালীন বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। বিদেশি পর্যটক টানতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সহজ শর্তে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদনে বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনার কারণে বহুমুখী পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিদেশি পর্যটক টানতে পরিবেশবান্ধব ইকো ট্যুরিজম ও বহুমুখী সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা দরকার।
জেলায় দেশি–বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ রয়েছে বলে জানান কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান। তিনি বলেন, চলতি বছর কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। সফল পর্যটন গন্তব্যগুলোতে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা, পরিকল্পিত বিনোদন ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কক্সবাজারকেও সেদিকে এগোতে হবে।