মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্ত
মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্ত

ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু, পরিবার বলছে ‘নির্যাতনে’, পুলিশের দাবি ‘অসুস্থ হয়ে’

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের পিটুনিতে অসুস্থ হয়ে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। আজ রোববার সকাল আটটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

গতকাল শনিবার বিকেল পাঁচটার দিকে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্ত (২৭) নামের ওই যুবককে আটক করে ডিবি। এ সময় তাঁকে তাঁর মায়ের সামনেই পেটানো হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।

তবে ডিবি পুলিশের দাবি, ওই যুবককে নির্যাতন করা হয়নি। তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি আজ ভোরে তাঁকে নাশতা করানো হয়েছে।

মারা যাওয়া মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লার বাসিন্দা প্রয়াত এসকেন হায়দারের ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে ইশতিয়াক বড় ছিলেন। তিনি ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ইশতিয়াক ছাত্রলীগের ‘একনিষ্ঠ কর্মী’ জানিয়ে শোকবার্তা দিয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনটির ফরিদপুর জেলা শাখা।

মির্জা ইশতিয়াকের মামা মো. সাখাওয়াৎ হোসেনের ভাষ্য, গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁর ভাগনে ইশতিয়াক বাড়ির সামনে ছিলেন। এ সময় একটি মাইক্রোবাসে করে ডিবি পুলিশের ১২-১৩ জন সদস্য এসে ইশতিয়াককে আটক করে মারধর করেন। ইশতিয়াকের মা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বাড়ির মধ্যে ঢুকে প্রতিটি কক্ষের যাবতীয় জিনিসপত্র তছনছ করেন। এরপর তাঁর ভাগনেকে গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে যান।

ইশতিয়াকের পরিবারের সদস্যদের দাবি, গতকাল সারা রাত পরিবারের সদস্যরা মধুখালী থানা, ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে ইশতিয়াকের কোনো হদিস পাননি। পরে আজ সকাল আটটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পারেন।

ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তারের ভাষ্য, ‘ইশতিয়াককে আটকের সময় তার দেহ তল্লাশি করে মাদকজাতীয় কোনো দ্রব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ডিবি পুলিশ বাড়ির প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি করে বিন্দুমাত্র মাদকসামগ্রী উদ্ধার করতে পারেনি। তবে শুনেছি, পুলিশ তিন পুরিয়া গাঁজা উদ্ধারের দাবি করেছে।’

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে খাদিজা বেগম বলেন, ‘কোন অপরাধে আমার সুস্থ নিরীহ ছেলেকে ধরে নিয়ে ডিবি হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হইল, আমি এ হত্যার বিচার চাই।’

পরিবারের দাবি, ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান ও এসআই মো. মোতাহার আলীর নেতৃত্বে এ অভিযানে অংশ নেন এএসআই মো. হাজিকুল ইসলাম, কনস্টবেল মনিরুজ্জামান, ফরহাদ হোসেন মিয়া, রাকিব মোল্লা সুফিয়ান, রকিবুল ইসলাম ও চম্পা হালদার। গাড়িচালক ছিলেন মো. সবুজ মোল্লা।

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাদকসহ ইশতিয়াককে তাঁর বাড়ির সামনে থেকে গতকাল সন্ধ্যায় আটক করা হয়। তাঁকে নিয়ে ডিবি পুলিশ রাত তিনটার দিকে ডিবি কার্যালয়ে আসেন। এখানে আসার পর তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং প্রাতরাশ গ্রহণ করেন। ভোরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকাল আটটার দিকে তিনি মারা যান।’

ইশতিয়াককে আটকের পর মারধর করা হয়নি দাবি করে ডিবির ওসি বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে ডিবি পুলিশ অত্যন্ত সুন্দর ও অমায়িক ব্যবহার করেছে। তাঁকে নাশতা খাইয়েছে।’
মধুখালী থানার ওসি সুকদেব রায় বলেন, এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ বাদী হয়ে ইশতিয়াককে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করে। ইশতিয়াকের নামে আগে কোনো মামলা আছে কি না, সেটি তিনি জানাতে পারেননি।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘শেখ ইশতিয়াককে বাড়ি থেকে মাদকসহ জেলা গোয়েন্দা শাখা ধরে নিয়ে আসে। তাঁকে আমাদের কাস্টডিতে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে আমাদের কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থতাবোধ করলে তাঁকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল ও পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মারা গেছেন। আমরা প্রাথমিকভাবে এটা এনসিওর (নিশ্চিত) করেছি যে তাঁর শরীরে কোনো ধরনের জখম ছিল না। আমাদের পুলিশের হেফাজতে কোনো ধরনের আঘাত করা বা এ রকম কিছু ঘটনা করা হয়নি।’ এ ঘটনায় পুলিশ অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করবে বলে জানান তিনি।