খেজুরগাছের মডেলটির সামনে গ্লাস ধরলে খেজুরের রসে ভরে যায়। গত শনিবার দুপুরে রাজশাহীর চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে
খেজুরগাছের মডেলটির সামনে গ্লাস ধরলে খেজুরের রসে ভরে যায়। গত শনিবার দুপুরে রাজশাহীর চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে

‘তৃতীয় গুড় সম্মেলন’

‘আমাকে একটু রস দাও’ বলতেই খেজুরের রসে ভরে যায় গ্লাস

‘আমাকে একটু রস দাও’—খেজুরগাছের নিচে গ্লাস পেতে এ কথা বললেই রসে ভরে যাচ্ছিল। অবশ্য গাছটি জ্যান্ত নয়, খেজুরগাছের একটি মডেল। গ্লাসে রস ঢালার ব্যাপারটি ‘বিশেষ সেন্সর’ লাগিয়ে করা হয়েছিল। অতিথিদের আনন্দ দিতে গত শনিবার রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত ‘তৃতীয় গুড় সম্মেলনে’ এই ব্যবস্থা ছিল। সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে সবার প্রথম কাজই ছিল এক গ্লাস খেজুরের রস পান করা।

‘রস ও গুড়’ নামের একটি ফেসবুক পেজের উদ্যোক্তারা সারা দেশে ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের এক ছাতার নিচে আনতে দিনব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করেন। রাজশাহীর চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে বসেছিল এই মিলনমেলা। সারা দেশ থেকে ৪৫০ জন উদ্যোক্তা এতে যোগ দেন।

গ্লাসে রস ভরার প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা ও মধু–গবেষক সৈয়দ মঈনুল আনোয়ার। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, গ্লাসে রস ঢালার কাজটি একটি সেন্সরের মাধ্যমে হচ্ছে, মুখে না বললেও চলবে। নির্দিষ্ট স্থানে পাত্র রাখলেই রসে ভরে যাবে। তবে সবাইকে আনন্দ দিতেই শনিবার সকালে কথাটি চালু করে দেন তিনি। সারা দিন সবাই গ্লাস পেতে বলতে থাকেন, ‘আমাকে একটু রস দাও।’

কেউ চাইলে বোতলভর্তি খেজুরের রসও ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল গ্লাসে। গত শনিবার দুপুরে চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে

উৎসবে ২০০ লিটার কাঁচা রসের জোগান দিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের উদ্যোক্তা সারোয়ার জাহান। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘পালকি’র পক্ষ থেকে তিনি দাঁড়িয়ে থেকে রস খাওয়ানো তদারক করছিলেন। শুধু তিনি নন, যে যাঁর পণ্য নিয়ে এসেছেন। একজনের পণ্য আরেকজনকে খাওয়াচ্ছিলেন, উপহার দিচ্ছিলেন। যেন অন্য রকম এক উৎসব।

‘রস ও গুড়’ নামের একটি ফেসবুক পেজের উদ্যোক্তারা সারা দেশে ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের এক ছাতার নিচে আনতে শনিবার দিনব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করেন। সারা দেশ থেকে ৪৫০ জন উদ্যোক্তা এতে যোগ দেন।

অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকতেই ডান পাশে একটি স্টলের ব্যানারে লেখা ‘শীতের মিষ্টি শুভেচ্ছা’। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান সবার হাতে রজনীগন্ধা ও গোলাপের তোড়া তুলে দিচ্ছিলেন। তিনি ই-কমার্স ম্যানেজমেন্টের উদ্যোক্তা। যশোর থেকে ফুল এনে রাত জেগে নিজের লোকজন নিয়ে ৫০০টি তোড়া বানিয়েছেন। স্টলের ভেতরে লেখা ‘ব্যবসা হোক গুড়ের মতো মিষ্টি’। ফুল ছাড়াও সবার জন্য সকালের নাশতা ও কফির ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। একটি স্টলে সারাক্ষণ মেশিনে কফি তৈরি হচ্ছিল, যাঁর খুশি গিয়ে পান করেন। আরেকটি স্টল থেকে দেওয়া হচ্ছিল নাশতার প্যাকেট।

খেজুরের রস পানে ব্যস্ত একজন। গত শনিবার দুপুরে চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে

একইভাবে সৈনিক ফুড বিডির উদ্যোগে পরিবেশন করা হচ্ছিল খেজুর, আখ ও তালের গুড়ের চা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যোক্তা শফিকুল ইসলাম নিজ হাতে তিন রকমের চা বানিয়ে সবাইকে খাওয়াচ্ছিলেন।

অনুষ্ঠানের প্রতিটি আয়োজনে সৃজনশীলতার ছাপ। মূল ফটক বানানো হয়েছে খেজুরপাতার পাটি দিয়ে। দুই পাশে দুটি স্লোগান, ‘রস ঢেকে রাখি, নিরাপদে থাকি’ ও ‘গাছি বাঁচলে গুড়শিল্প বাঁচবে’।

ফুল দিয়ে সম্মান করবে, সেটা কল্পনাই করিনি। জীবনে এ রকম অনুষ্ঠানে যাইনি।
—আব্দুল আজিজ, গাছি

ভেতরে ঢোকার আগেই প্রত্যেকের হাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে একটি করে ব্যাগ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। ব্যাগে ছিল চাঁপাই আমবাগানের আমসত্ত্বের আচার, তুরফা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের গুঁড়া খেজুর গুড়, আস্থা ডটকমের আচার, আজমিরি ফার্ম অ্যান্ড ড্রাই ফুডের খেজুর, আদ্‌–দ্বীন ফুডের ক্যাপ, খাঁটিজের ঘি, তাজকিয়ার ফুলের শোপিস ও গ্রিন ফুড অ্যান্ড বেভারেজের শষে৴র তেল।

এরই মধ্যে এক পাশে একটি প্যান্ডেলে চলছে অভিজ্ঞতা বিনিময়। রাজবাড়ীর উদ্যোক্তা সোলাইমানের সাফল্যের গল্প ছিল একটি চমক। একটি সুপারশপের আউটলেটে ২৬ কেজি গুড় দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। গত বছর তাঁর কাছ থেকে দৈনিক এক টন করে গুড় নিয়েছে সুপারশপটি।

রাজশাহীর মৌমাছি ও মধু পাঠাগারের উদ্যোক্তা আকমাল মাহমুদ বললেন, তরুণ উদ্যোক্তারা জানেন না, কীভাবে বাজার ধরতে হয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাজে লাগবে।

মঞ্চে নয়জন গাছিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। গত শনিবার দুপুরে চারঘাটে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির বিনোদন পার্কে

সম্মেলনের আয়োজন ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। মঞ্চে নয়জন গাছিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন রাজশাহীর পুঠিয়ার ছত্রগাছা গ্রামের মুস্তাক আহমেদ, সাইফুল ইসলাম, জালাল উদ্দিন, নুর ইসলাম ও মোস্তফা, ভাল্লুকগাছি গ্রামের শুকুর আলী, দুর্গাপুরের সিদ্দিকুর রহমান, আবদুল আজিজ এবং ঝিনাইদহের সফর আলী।

৭০ বছর বয়সী আবদুল আজিজ প্রতিদিন ৫০টি গাছ কাটতে পারেন। তিনি বলেন, ‘ফুল দিয়ে সম্মান করবে, সেটা কল্পনাই করিনি। জীবনে এ রকম অনুষ্ঠানে যাইনি।’

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম। তিনি উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, মধুর পরেই মিষ্টি বলতে গুড়। চিনি গুড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। তিনি গুড় তৈরির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় জ্বাল দিলে খেজুর গুড়ের সুঘ্রাণ থাকে না, রংও নষ্ট হয়ে যায়। বিদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে মানসম্পন্ন উৎপাদনে যেতে হবে।

নোয়াখালীর আরেক উদ্যোক্তা সারোয়ার জাহান তাঁর শুঁটকিভর্তার বিদেশের বাজারের গল্প শুনিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। দিনভর চলে শুঁটকিভর্তার মতোই মুখরোচক সব আলোচনা।