
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে অন্য রকম উচ্ছ্বাস। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভোরেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রওনা হয় অনেক শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠান শুরুর দুই ঘণ্টা আগেই বারহাট্টা উপজেলার কাশবন গ্রাম থেকে মাকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসে প্রাচুর্য দেবনাথ। ভোরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কোনো যানবাহন না পেয়ে মায়ের সঙ্গে অনেকটা পথ হেঁটে ও ইজিবাইকে অনুষ্ঠানস্থলে আসে সে।
সংবর্ধনায় যোগ দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত কাশবন উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পাওয়া প্রাচুর্য দেবনাথ। প্রাচুর্য বলল, ‘অনুষ্ঠানে আসার জন্য রাতে খুব কম ঘুম হয়েছে। বারবার মুঠোফোনে সময় দেখছিলাম, কখন সকাল হবে।’
প্রাচুর্যের মতো কলমাকান্দার গুতুরারা থেকে মিম আক্তার, আটপাড়ার তপলিগাতি থেকে সাইমা ইসলাম, মদনের ঝাউলা থেকে দুর্জয় চন্দ্র সেন, পূর্বধলার বালুচড়া থেকে ফারজানা আক্তার ঐশী ও বারহাট্টার দত্তগ্রাম থেকে অপর্ণা রানী সরকারসহ প্রত্যন্ত এলাকার অনেক কৃতী শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। তারা জানায়, এমন আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তাদের খুব ভালো লেগেছে।
আজ মঙ্গলবার সকালে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকার জেলা পাবলিক হলে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস–উদ্দীপনা ছিল।
সকাল সাড়ে আটটা থেকেই দূরদূরান্ত থেকে নিবন্ধিত কৃতী শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে। অনেক দিন পর বন্ধুদের দেখা পেয়ে কেউ জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, কেউ একসঙ্গে ছবি তোলে। এ সময় কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে অনুষ্ঠানস্থল মুখর হয়ে ওঠে।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
আজ সকাল ১০টায় নেত্রকোনা বন্ধুসভার সদস্যদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নেত্রকোনা প্রতিনিধি পল্লব চক্রবর্তী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা প্রথম আলো বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজমেরি ইসলাম।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রার্থনা সংগীত ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ পরিবেশন করেন জেলা উদীচীর সহসভাপতি নারায়ণ কর্মকার। শিল্পী সোহেল রানা ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, আর উদীচীর শিল্পী সোহাগ বণিক ‘এমন যদি হতো আমি পাখির মতো’ গান পরিবেশন করেন। কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাচুর্য দেবনাথ ‘কেউ হতে চায় ডাক্তার কেউবা ইঞ্জিনিয়ার’, আর স্বর্ণা চৌধুরী রবীন্দ্রসংগীত ‘গানের ভেলায় বেলা অবেলায়’ পরিবেশন করে। শিল্পীদের সঙ্গে তবলায় ছিলেন ওস্তাদ সুব্রত রায়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সরোজ মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘মানুষকে প্রতিনিয়ত মানুষ হয়ে উঠতে হয়। যে শিক্ষা মানুষকে পরিপূর্ণ ও উদার হতে শেখায় এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে, সে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আর বইপড়া ছাড়া কেউ জ্ঞান লাভ করতে পারে না।’
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘শুধু ভালো লেখাপড়া করলেই চলবে না, আগে ভালো মানুষ হতে হবে। শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অন্তরে আলো প্রজ্বালিত করে মনুষ্যত্ব তৈরি করা। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সৎ, যোগ্য ও দায়িত্ববান নাগরিক হওয়ার জন্য আরও অনেক কিছু শিখতে হবে।’ এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থ—এই তিন বিষয়কে ‘না’ বলার অঙ্গীকার করান।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. শামসুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের তাঁর জীবনের গল্প শোনান। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন শামসুল ইসলাম নানা বাধা পেরিয়ে ৩৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে তাঁর বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার কথা শোনান তিনি।
মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করেন প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রথম আলোর চিফ ডিজিটাল বিজনেস অফিসার জাবেদ সুলতান।