দুই মাস ধরে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু থাকা–খাওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকায় ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন। ফেরার আগে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে আইসিইউ ওয়ার্ডের সামনে বিষণ্ন হয়ে বসে আছেন শাহিদা খাতুন। গত রোববার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
দুই মাস ধরে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু থাকা–খাওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকায় ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন। ফেরার আগে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে আইসিইউ ওয়ার্ডের সামনে বিষণ্ন হয়ে বসে আছেন শাহিদা খাতুন। গত রোববার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে

হামে আক্রান্ত ছেলের চিকিৎসাসহায়তার চেক ভাঙাতে পারছেন না মা

হামে আক্রান্ত ছেলের চিকিৎসার জন্য অনুদানের চেক পেলেও ছেলের জন্য ওষুধ কিনতে পারছেন না মা শাহিদা খাতুন। টাকার অভাবে হামে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

গত রোববার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদ শিশুটির মা শাহিদা খাতুনের হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। কিন্তু বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁর ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারেননি এবং সেই চেক ভাঙাতে পারছেন না। ছেলের জন্য ওষুধও কিনতে পারছেন না। একবার ব্যাংকে যাচ্ছেন, আবার জেলা পরিষদের প্রশাসকের কার্যালয়ে দৌড়াচ্ছেন।

শাহিদা খাতুনের (১৭) বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার নয়দিয়াড়ী সিরোটোলা গ্রামে। তাঁর স্বামী ডালিম আলী একজন দিনমজুর। তিনি চট্টগ্রামে কাজ করেন। শাহিদার বাবা জুয়েল আলী ঢাকায় রিকশা চালান। শাহিদার ছেলের বয়স এখন চার মাস। তার মধ্যে দুই মাসই ছিল হাসপাতালে। বাচ্চার চিকিৎসার জন্য শাহিদা রিকশাচালক বাবার তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। গরু বিক্রির তিন লাখ টাকা চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে যায়। এরপর ছেলের চিকিৎসার জন্য রাজশাহী শহরে থাকা-খাওয়া বাবদ তাঁদের কোনো টাকাপয়সা ছিল না।

শাহিদার নামে জেলা পরিষদের প্রশাসক যে চেক দিয়েছেন, সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখা সেটি ফেরত দিয়েছে। কারণ, ব্যাংকে চেক জমা দিয়ে টাকা তুলতে হলে একটা হিসাব নম্বর খুলতে হবে। শাহিদার বয়স ১৮ না হওয়ায় হিসাব নম্বর খোলা যাচ্ছে না। এ জন্য চেক পাওয়ার পর ছয় দিন ধরে তিনি এখানে-ওখানে দৌড়াদৌড়ি করছেন। বিভিন্ন লোকের পরামর্শ নিচ্ছেন। কিন্তু চেক ভাঙানোর কিনারা করতে পারেননি। শাহিদার নামে ক্রস চেক দিয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক। এখন তাঁর নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামে করে দিতে চান; কিন্তু স্বামী চট্টগ্রাম থেকে কাজ ফেলে বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। এ নিয়ে পরিবারটি মহাসংকটে পড়েছে।

শাহিদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী এখন চট্টগ্রামে কাজে গেছেন। এ অবস্থায় ফিরে এলে তারা কোনো টাকাপয়সা দেবে না। স্বামীর কাছেও বাড়তি কোনো টাকা নেই। সে জন্য কাজ বাদ দিয়ে ফিরতেও পারছেন না। এদিকে কাগজপত্রে তাঁর বয়স এখন ১৭ বছর চলছে; তাঁর নামেই চেক দেওয়া হয়েছে।

শাহিদার ছেলের প্রথমে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই মাস বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে প্রথম হাসপাতালে আসেন তিনি। একটানা ২০ দিন হাসপাতালে ছিলেন। তখন তিন দিন আইসিইউতে রাখতে হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ মনে হলে চিকিৎসক ছাড়পত্র দেন। দুই দিন বাড়িতে থাকার পর ছেলের গায়ে হাম ওঠে। তখনই হাসপাতাল ফেরত আসেন। দ্বিতীয় দফায় ভর্তির ১০ দিন পর শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পাঁচ দিন আইসিইউতে রাখার পর আবার ওয়ার্ডে পাঠায়। হাম ঠিক হওয়ার পর নানা জটিলতা শুরু হয়। এখন নিউমোনিয়া, ঠান্ডা লাগা, ফুসফুসের সমস্যা ও রক্তে জীবাণু ধরা পড়েছে। গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন আইসিইউতে ছিল। অক্সিজেন খুলে দিলেই বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।

শাহিদা তখন বলেছিলেন, এবার আইসিইউতে আসার পর তাঁদের হাতের টাকাপয়সা সব শেষ হয়ে গেছে। আর হাসপাতালে থাকার উপায় নেই। তাঁরা চলে যেতে চান। কিন্তু তিন–চার দিন ধরে আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু শহরে থাকা-খাওয়ার খরচ আছে। তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। তাঁরা আর থাকতে চান না।

এ নিয়ে গত ২৭ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘৪ চার মাসের শিশুর ২ মাস ধরে হাসপাতালে, নিঃস্ব পরিবার লড়ছে খরচ জোগাতে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। খবর দেখে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ ২০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা শেষ হয়ে গেলে তাঁরা হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছায় ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে যান। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শে আগামী তিন মাস ধরে বাচ্চাকে নির্ধারিত ইনজেকশন দিতে হবে। তাঁরা সেই টাকা জোগাড় করতে পারছিলেন না। খবর পেয়ে ১৭ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ শিশুটির মায়ের হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। সোনালী ব্যাংকের চেকটি নিয়েই তাঁরা ঝামেলায় পড়েছেন।

আজ শুক্রবার সকালে শাহিদার মা পারভিন বেগম এই প্রতিবেদককে ফোন করে কান্নাকাটি করেন। তিনি বলেন, মেয়েকে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে যে ভুল করেছেন, জীবনে আর এই ভুল দ্বিতীয়বার করবেন না। ছোট মেয়েকে বয়স হলেই বিয়ে দেবেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আগামীকাল (শনিবার) আবার জেলা পরিষদে যাব। আপনারা একটু কহেন না ভাই। আপনারা কহিলে ভক করে কাজটা হয়ে যাবে। হামরা ধুড়ছি আর ধুড়ছি (ঘুরছি)।’