
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক নতুন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে, বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। তবে সেই অনুপাতে বাড়েনি শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক। ফলে আইন ও বিচার বিভাগ, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকটের মধ্যেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। কোথাও অন্য বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ধার করে, কোথাও মিলনায়তনে ক্লাস নিতে হচ্ছে। আবার শিক্ষকসংকটে কোনো কোনো বিভাগ নির্ভর করছে অতিথি শিক্ষকের ওপর।
আইন ও বিচার বিভাগের ছয়টি ব্যাচের ৩৭০ শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষই নেই। অথচ ১৫ বছর আগে বিভাগটি চালু হয়েছে। ৮ বছর আগে চালু হওয়া তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের সাতটি ব্যাচের ২৪৫ শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ রয়েছে দুটি। অন্যদিকে আরও পুরোনো ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চার বিভাগের ১ হাজার ৫৪৩ শিক্ষার্থীর জন্য তিনটি করে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে ১২টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় নতুন হল, প্রশাসনিক ভবন ও কয়েকটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলেও এসব বিভাগের জন্য কোনো একাডেমিক ভবন রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য হিসেবে যিনিই দায়িত্বে আসেন, তিনিই এসব সংকট নিরসনের আশ্বাস দিয়ে যান। তবে সেসব আশ্বাস আর আলোর মুখ দেখে না।
অন্য বিভাগে চলে পাঠদান
২০১১ সালে আইন অনুষদের অধীন আইন ও বিচার বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে বিভাগটির ছয়টি ব্যাচে ৩৭০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনে অবস্থিত এ বিভাগের নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই। শুধু শিক্ষকদের বসার জন্য কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। তবে ডিনের আলাদা কার্যালয় নেই। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ধার করে ও কিছুটা দূরে অবস্থিত জহির রায়হান মিলনায়তনে তাদের শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
বিভাগটির স্নাতকোত্তরের (৫০তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী ওসমান সরদার বলেন, অনেক সময় যে বিভাগ থেকে কক্ষ নেওয়া হয়, তাদের শিক্ষার্থীরা চলে এলে ক্লাসের মাঝপথেই শিক্ষকসহ বের হয়ে যেতে হয়।
আইন বিভাগে শিক্ষকসংকটও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১২ জন স্থায়ী শিক্ষকের মধ্যে বর্তমানে ৮ শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে। ২৩ আগস্ট আরও একজন শিক্ষাছুটিতে যাবেন। ফলে অধিকাংশ কোর্সের পাঠদান চলছে অতিথি শিক্ষকের মাধ্যমে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অতিথি শিক্ষকেরা সাধারণত সপ্তাহে একটি করে ক্লাস নেন। অনেক সময় একটি ক্লাস টানা তিন ঘণ্টা পর্যন্ত করতে হয়। আবার বাইরে থেকে আসা কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিতে না পারায় পাঠ্যসূচিও ব্যাহত হয়।
আইন ও বিচার অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কোনো রকম শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ আইন অনুষদকে দেওয়া হয়নি। নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই, অডিটোরিয়ামের কক্ষ আমরা ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করি। এটার আশপাশে কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস চলতেই থাকে। আইন অনুষদের অত্যাবশ্যকীয় হলো মুট কোর্ট (ছায়া আদালত) যেটি ব্যবহারিকের জন্য প্রয়োজনীয়। সেটার ব্যবস্থাও নেই।’
দুটি শ্রেণিকক্ষে সাত ব্যাচ
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে প্রথম ব্যাচে শিক্ষার্থী ছিলেন ২৫ জন। বর্তমানে সাতটি ব্যাচে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে ২৪৫ জন। আল-বেরুনী হল–সংলগ্ন পুরোনো ভবনে অবস্থিত এ ইনস্টিটিউটটির নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র দুটি। স্থায়ী শিক্ষক ছয়জন। ফলে একটি বর্ষের ক্লাস বা পরীক্ষা চললে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হয়। সম্প্রতি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি গবেষণাগারের কক্ষ ধার নিয়েও ক্লাস নিতে হচ্ছে তাদের। এটি এই ইনস্টিটিউট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এ বিষয়ে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, একেক ক্লাস একেক জায়গায়। এতে সময় নষ্ট হয়, ভোগান্তিও পোহাতে হয়।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদেও একই চিত্র
২০০৯ সালে মার্কেটিং এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ নিয়ে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের যাত্রা। পরের বছর চালু হয় ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ। বর্তমানে ৪ বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে ২৮টি ব্যাচে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৪৩।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা মাত্র ১২। অনুষদে কোনো সেমিনারকক্ষ বা কমনরুম নেই। চারটি বিভাগের জন্য রয়েছে মাত্র একটি কম্পিউটার ল্যাব। শিক্ষকদের বসার স্থানও অপ্রতুল।
শিক্ষার্থীরা জানান, একটি ক্লাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে শেষ হলে পরবর্তী ক্লাসেও তার প্রভাব পড়ে। আবার কোনো কারণে একটি ক্লাস বাতিল হলে পরে সেটি সমন্বয় করার দুষ্কর হয়ে পড়ে।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের কয়েকটি বিভাগে শিক্ষকসংকটও রয়েছে। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসে ১২ শিক্ষকের মধ্যে এখন পাঠদান করছেন ৫ জন, বাকি ৭ জন শিক্ষাছুটিতে। ফিন্যান্সে ১২ শিক্ষকের মধ্যে ৩ জন ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে ১২ জনের মধ্যে ২ জন শিক্ষাছুটিতে আছেন।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবু সাঈফ মো. মুনতাকিমুল বারী বলেন, ‘আমাদের বিভাগগুলো এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালের পুরোনো ভবনে চলছে। শ্রেণিকক্ষসহ নানা সংকটের মধ্যেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে আমাদের অনুষদের জন্য কোনো ভবন রাখা হয়নি।’
উন্নয়ন প্রকল্পে উপেক্ষিত
বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, একটি প্রকল্প দিয়ে সব ধরনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রকল্প প্রণয়নের সময় বিভিন্ন ইউনিট থেকে যে চাহিদা পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে এসব বিভাগের জন্য পৃথক একাডেমিক ভবনের বিষয়টি ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প হলে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আসতে পারে।
একই বিভাগের অনেক শিক্ষক একই সময়ে শিক্ষাছুটিতে থাকার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, ‘একই সময়ে একটি বিভাগ থেকে যদি অনেক শিক্ষক ছুটিতে যান, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিভাগে চাপ পড়ে। কিন্তু কোনো শিক্ষক বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পেলে তাঁকে আর আটকে রাখা যায় না। মানবিক দিক বিবেচনা করে সম্ভব হয় না। তবে আমরা নতুন দায়িত্বে এসেছি। বিষয়গুলো আলোচনা করে একটি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘সাময়িক সমাধান কোনো কার্যকর সমাধান নয়। তবু তাদের আপাতত সংকটগুলো কাটিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ভবনে ও লেকচার থিয়েটারে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। তবে আমরা এসব অনুষদের জন্য একটি ডিপিবি (পরিকল্পনা ও বাজেট) প্রস্তুত করছি। আমি চেষ্টা করব তাদের জন্য আলাদা স্থায়ী ভবনের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাস করানোর।’