আলমের লাশ দাফনের আগে বাড়িতে ভিড় করছেন স্বজনেরা। গতকাল রোববার বিকেলে পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড-প্রধানপাড়া এলাকায়
আলমের লাশ দাফনের আগে বাড়িতে ভিড় করছেন স্বজনেরা। গতকাল রোববার বিকেলে পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড-প্রধানপাড়া এলাকায়

রাতে ভাত খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে যুবকের মৃত্যু, স্ত্রীকে পুলিশে দিল পরিবার

পঞ্চগড়ে রাতের খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে এক দিনমজুরের মৃত্যু হয়েছে। তাঁকে খাবারের সঙ্গে বিষাক্ত কিছু খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। লাশ দাফনের পরদিন সোমবার বিকেলে পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ওই নারীকে পুলিশে সোপর্দ করেন।

দিনমজুর মো. আলম (২৮) পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের শিংরোড-প্রধানপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রীর নাম মৌসুমি আক্তার (২৫)। আলমের শ্বশুরবাড়ি বোদা উপজেলার আমতলা এলাকায়। তাঁদের এক মেয়ে (৭) ও এক ছেলে (৫) রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, আলমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের পর ভিসেরা পরীক্ষার (মৃত্যুর সঠিক কারণ জানার জন্য শরীরের ভেতরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা) জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার রাত নয়টার পর ভাত খেয়ে ঘুমাতে যান আলম। কিছুক্ষণ পর পেটব্যথা ও জ্বালাপোড়া হচ্ছে বলে বিছানা থেকে উঠে বমি করতে শুরু করেন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। রংপুরে নেওয়ার পথে দেবীগঞ্জ এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

পরে পরিবারের সদস্যরা লাশ বাড়িতে নিয়ে যান। খবর পেয়ে দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার পর পুলিশ বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। গতকাল রোববার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে আলমের লাশ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় রোববার পঞ্চগড় সদর থানায় অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা হয়েছে।

আলমের বড় ভাই আবদুল করিম বলেন, শনিবার দিনের বেলা বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মৌসুমি। সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফেরেন। রাতে ভাত খাওয়ার সময় আলম ভাত তেতো লাগছে বলে জানান। তখন মৌসুমি বলেন, বাচ্চাদের ওষুধ খাওয়ানোর পর ভাত দেওয়ায় এমন লাগতে পারে।

আবদুল করিমের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে তাঁদের সন্দেহ হলেও মৌসুমি খাবারে কিছু মেশানোর কথা স্বীকার করেননি। তবে সোমবার তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বাবুল হোসেন নামের স্থানীয় এক যুবকের দেওয়া ওষুধ পানিতে মিশিয়ে আলমকে খাওয়ানোর কথা স্বীকার করেন। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাঁদের বাড়িতে জড়ো হয়ে মৌসুমিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি করেন। পরে পুলিশ এসে তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।

পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আগে মৌসুমি পরিবারের সদস্যদের জানান, বাবুল নামের স্থানীয় এক যুবক প্রায় এক বছর ধরে তাঁকে ফোনে ও বিভিন্নভাবে বিরক্ত করছিলেন। বাবুল তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক করতে চেয়েছিলেন এবং সময় না দিলে সন্তানদের অপহরণের হুমকি দিতেন।

মৌসুমির ভাষ্য, ‘শনিবার বাবুল আমাকে কাগজে মোড়ানো দুটি খোলা ট্যাবলেট দিয়ে রাতে আমার স্বামীকে খাওয়াতে বলেন এবং ওষুধ খেয়ে স্বামী ঘুমিয়ে গেলে রাতে দেখা করতে বলেন। তাঁর কথা অনুযায়ী, ভাত খাওয়ার সময় পানিতে মিশিয়ে স্বামীকে ওই ওষুধ খাওয়াইছি। আমি জানি সে শুধু ঘুমাবে; মারা যাবে, এটা ভাবিনি।’

পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মো. রেজওয়ান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার রাতে আলমকে খিঁচুনি নিয়ে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর মুখে হালকা ফেনা বা লালা ছিল। ফুড পয়জনিংয়ের সন্দেহ করা হয়েছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পর পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

রেজওয়ান উল্লাহ জানান, ময়নাতদন্তের সময় আলমের পাকস্থলীতে খাবার পাওয়া গেছে। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় আলমের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান পঞ্চগড় সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশীষ কুমার শীল।