
চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকার ১০ তলা বিপণিবিতান গাজি টাওয়ারের নিচতলায় মোহছেন আউলিয়া খেলাঘর। সড়কের দিকে মুখ করা ছোট দোকানটিতে বেশ ভিড়। বাইরে থেকে দেখলে ঈদের কেনাবেচা চলছে ভেবে ভুল হতে পারে। দোকানময় ঝুলছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দলের জার্সি। প্রিয় দলের পাশাপাশি প্রিয় তারকার জার্সি নম্বর মিলিয়েও কিনছেন ক্রেতারা। ক্রেতা–বিক্রেতাদের দরদামে মুখরিত পুরো দোকান। ভিড়ের মধ্যই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন এক তরুণ। বললেন, ‘ভাই, একটা মেসির জার্সি দিন।’
হালকা–পাতলা গড়নের ওই তরুণের নাম মাহমুদুল হাসান। নগরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। মেসি কেন জানতে চাইলে ওই তরুণ বিস্ময়ের সঙ্গে তাকান। বলেন, ‘আরে মেসির ওপরে আর কে আছে! সর্বকালের সেরা ফুটবলার তো মেসিই। আমাদের ভাগ্য যে তিনি যখন খেলছেন তখন আমরা জন্মেছি, তাঁর খেলাও দেখছি। এসব একদিন ইতিহাস হয়ে থাকবে।’ মাহমুদুল হাসান আর্জেন্টিনার হোম জার্সি কিনেছেন ৫০০ টাকায়। সঙ্গে মেসির জার্সিও। সেটির দাম পড়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
তিন দিন পরই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হবে। প্রথমবারের মতো এবার অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। দলগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতি গ্রুপে আছে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউটসহ পুরো টুর্নামেন্টে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। ১১ জুন মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়ে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে বিশ্বকাপের। প্রায় ৩৯ দিনব্যাপী এই আসর যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উন্মাদনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আড্ডা, বাজার—সবখানেই এখন বিশ্বকাপের আলোচনা। কাগজে–কলমে আর ফুটবলবোদ্ধাদের বিবেচনায় যে–ই এগিয়ে থাকুক না কেন, মাহমুদুলের মতো বাংলাদেশি সমর্থকদের কাছে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলই ফেবারিট।
বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই নগরের অলিগলিতে দেখা মিলছে বিভিন্ন দলের পতাকা। একসময় ক্লাব ফুটবলের আবাহনী ও মোহামেডানের উন্মাদনা এখন বদলে গিয়ে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনার উন্মাদনায় রূপান্তরিত হয়েছে। ফুটবল নিয়ে উৎসাহ, পাগলামি সবই আগের মতো আছে, কেবল বদলেছে দল। নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রিয় দল নিয়ে শোভাযাত্রা হয়েছে। এখন জার্সির বাজারও চাঙা। তবে বাজারে সব দলের জার্সির কদর সমান নয়। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের জার্সি যত বিক্রি হয়, বাদবাকিগুলো ততটা নয়।
বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই নগরের অলিগলিতে দেখা মিলছে নানা দলের পতাকা। একসময় ক্লাব ফুটবলের আবাহনী ও মোহামেডানের উন্মাদনা এখন বদলে গিয়ে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনার উন্মাদনায় রূপান্তরিত হয়েছে। ফুটবল নিয়ে উৎসাহ, পাগলামি সবই আগের মতো আছে, কেবল বদলেছে দল। নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রিয় দল নিয়ে শোভাযাত্রা হয়েছে। এখন জার্সির বাজারও চাঙা। তবে বাজারে সব দলের জার্সির কদর সমান নয়। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের জার্সি যত বিক্রি হয়, বাদবাকিগুলো ততটা নয়।
মোহছেন আউলিয়া দোকানের এক পাশে জার্সি রাখছিলেন কর্ণধার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে বিক্রি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপর ব্রাজিল। শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সীরাই জার্সি কিনছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মেসির জার্সি।
জাহাঙ্গীর জানান, দুই সপ্তাহ আগে থেকেই বিশ্বকাপের জার্সি বিক্রি শুরু করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে জার্সি সংগ্রহ করেন। এবার আর্জেন্টিনার জার্সির চাহিদা এত বেশি যে পাইকারি বাজারেও দাম বেড়েছে। অবশ্য আর্জেন্টিনার প্রতি তাঁর নিজেরও আলাদা টান আছে। ছোটবেলা থেকেই দলটির সমর্থক তিনি। প্রিয় খেলোয়াড় ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
হকার্স মার্কেট, স্টেডিয়াম, অ্যাপেলো শপিং কমপ্লেক্স, রেয়াজউদ্দিন বাজার ও নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন দোকান ও ফুটপাত ঘুরে জার্সির বিপুল সমাহার দেখা গেল। দোকানের সামনে সারি সারি ঝুলছে বিভিন্ন দেশের পতাকার রঙে সাজানো পোশাক। কেউ নিজের জন্য কিনছেন। কেউ কিনছেন সন্তানের জন্য। কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার প্রস্তুতি হিসেবে আগেভাগেই জার্সি সংগ্রহ করছেন।
নিউমার্কেট এলাকার গাজি টাওয়ারে অবস্থিত আর এম স্পোর্টস অ্যান্ড ট্রেডার্সেও ছিল একই চিত্র। দোকানে ঢুকতেই চোখে পড়ে জার্সির স্তূপ। একের পর এক ক্রেতা এসে জার্সি দেখছেন। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মিনহাজ উদ্দিন বলেন, বিশ্বকাপ এলেই জার্সির বাজার জমে ওঠে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপর ব্রাজিল, ফ্রান্স ও স্পেন। তাঁর দোকানে ২৮০ থেকে ১ হাজার টাকা দামের জার্সি পাওয়া যায়। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সীদের জন্য রয়েছে আলাদা সংগ্রহ। সাধারণ মানের জার্সি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। উন্নত কাপড়ের জার্সির দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। আর প্রিমিয়াম সংস্করণের দাম এক হাজার টাকার বেশি।
স্টেডিয়ামপাড়া জমজমাট
চট্টগ্রামের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে কাজীর দেউড়ির স্টেডিয়ামপাড়া এক পরিচিত ঠিকানা। এম এ আজিজ স্টেডিয়াম ঘিরে গড়ে ওঠা এই এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান। ক্রিকেট ব্যাট-বল, ফুটবল, বুট, গ্লাভস, ট্র্যাকস্যুট থেকে শুরু করে খেলাধুলার প্রায় সব সরঞ্জামই পাওয়া যায় এখানে।
সাধারণ সময়েও ক্রেতাদের ভিড় থাকে। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসর সামনে এলে পুরো এলাকার চেহারাই বদলে যায়। দোকানের সামনে ঝুলে যায় বিভিন্ন দেশের জার্সি। বাড়ে ক্রেতার ভিড়। অ্যাপোলো শপিং সেন্টারের নিচতলায় ইসমা স্পোর্টসে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের ভেতর-বাইরে মানুষের ভিড়। কেউ মেসির জার্সি খুঁজছেন। কেউ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। আবার কেউ খুঁজছেন এমবাপ্পের নাম লেখা জার্সি। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. শওকত আলী বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপটাই আমাদের জন্য ঈদ। এ সময় বিক্রি সাধারণ সময়ের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেড়ে যায়।’
মোহছেন আউলিয়া দোকানের এক পাশে জার্সি রাখছিলেন কর্ণধার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে বিক্রি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপর ব্রাজিল। শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সীরাই জার্সি কিনছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে মেসির জার্সি।
এই দোকানে চীন ও বাংলাদেশে তৈরি জার্সি পাওয়া যায়। তবে এবার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর লেখা জার্সি। বিশেষ করে মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে ও রোনালদোর নাম লেখা জার্সির চাহিদা বেশি। দল হিসেবে এগিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। শওকত আলী বলেন, মেসির জার্সিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। মেসি লেখা ১০ নম্বর জার্সি হলেই বিক্রির গ্যারান্টি আছে।
একসময় জার্সির বাজারে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ফ্রান্স ও স্পেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দুই দলের সাফল্যের কারণে তরুণদের মধ্যে তাদের সমর্থকও বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসের কর্ণধার তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেসির কারণে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা এখনো সবচেয়ে বেশি। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই স্পেন ও ফ্রান্সের জার্সি খুঁজছেন। তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।
অ্যাপোলো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে জার্সি বেছে নিচ্ছিলেন কলেজছাত্র ইশমাম উদ্দিন। কয়েকটি জার্সি দেখার পর শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন ফ্রান্সের নীল রঙের জার্সি। দাম পড়েছে ৯০০ টাকা। ইশমামের বিশ্বাস, এবার শিরোপা যাবে ফ্রান্সের ঘরে।
ইশমাম বলেন, ‘ফ্রান্স দলটা খুব গোছানো। প্রায় সব পজিশনেই ভালো খেলোয়াড় আছে। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের দারুণ সমন্বয় রয়েছে। তাই আমি মনে করি, তারাই সবচেয়ে বড় দাবিদার।’
তবে ইশমামের বন্ধু শাখাওয়াত হোসেন একমত নন। তিনি ব্রাজিলের সমর্থক। তাঁর দাবি, ষষ্ঠ শিরোপা জিতবে ব্রাজিলই। বিশ্বকাপের বাঁশি এখনো বাজেনি। তবে অপেক্ষার প্রহর দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।