
প্রচণ্ড তাপের হলকায় যখন সারা দেশ হাঁসফাঁস করছে, গাজীপুরে তখন সবার মন জুড়িয়ে দিল এক পশলা মেঘের জারি। অনাবৃষ্টি মানেই মেঘের জারি। এই দাবদাহে শরীর না জুড়াক, মেঘের জারি মনটা স্নিগ্ধ করে দিয়ে গেল।
অনাবৃষ্টির সঙ্গে মেঘের জারির সম্পর্ক এ দেশে অনেক পুরোনো। টানা কিছুদিন বৃষ্টি না হলেই গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা মিলে মেঘের জারির আয়োজন করেন। তাতে বৃষ্টি হবে, এমন বিশ্বাস তো আছেই। বিনোদনের অনুষঙ্গও কম নেই। মেঘের জারি এখনো জীবন্ত। কোনো কোনো অঞ্চলে দেওয়া হয় ব্যাঙের বিয়ে। কিন্তু গাজীপুর তো জারিরই অঞ্চল।
গাজীপুরে সবাই মিলে এখনো এ রকম মেঘের জারিতে অংশ নেন। গান গাওয়ার সময় সবার হাতে হাতে থাকে কলস, থালা, বাটি, কুলা, দেশি বাদ্যযন্ত্র আর চাষবাসের যন্ত্র। জারি গাইতে গাইতে পাড়ার এর–ওর বাড়িতে হাজির হওয়া, একে অন্যের শরীরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া, পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে সেখানে গড়াগড়ি খাওয়া মেঘের জারির অংশ।
সবাই মিলে আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায়। বাড়িতে উপস্থিত হলে বাড়ির কর্তারা সাধ্যমতো জারিতে অংশ নেওয়া মানুষকে থালায় তুলে দেন চাল, ডাল, টাকা বা রান্নার উপকরণ। অনেকে আবার এসব দিতে এসে নিজেও ভিড়ে যান জারির দলের সঙ্গে।
বেশ কিছুদিন বৃষ্টি নেই। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। প্রকৃতির এই তপ্ত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়া পশ্চিম খণ্ড (কড়ইতলা) গ্রামে হয়ে গেল মেঘের জারি। তরুণ, যুবক ও বয়স্ক মানুষ নেচে–গেয়ে, একে অপরের শরীরে পানি ছিটিয়ে মেঘের জারিতে প্রার্থনা করলেন বৃষ্টির। তাঁদের মুখে অতিপরিচিত সেই মেঘের জারি, আর্তহৃদয়ে প্রভুর কাছে সবাই কাতর হয়ে গায়, ‘আল্লা মেঘ দেও, পানি দেও,/ ছায়া দেওগো তুমি আল্লা মেঘ দেও।/ ধান বুনলান, পাট বুনলান পুইড়া হইল ছাই, সেই কারণে বাড়াই বাড়াই মেঘের জারি গাই।’
বিচিত্র সুর আর শারীরিক ভঙ্গিমার সঙ্গে মেঘের জারিতে উপচে পড়ছিল শ্রীপুর বা গাজীপুর অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় সৌন্দর্য। তাঁরা গাইছিলেন, ‘আমপাতা লড়েচড়ে, কাঁডলপাতা ঝরে,/ আল্লাহ যদি করে দয়া, মেঘ দিত পারে।/ কালা মেঘা, ধলা মেঘা, তারা দুটি ভাই/ এক জরি পানি পাইলে গড়াগড়ি যাই.../ কি পাপ করছি আল্লা, আমরা জানি না,/ মেঘের জারি গাইতে গাইতে গলায় মানে না/ আল্লা মেঘ দেও, পানি দেও।’
তবে মেঘের জারিতেই এবার ব্যাপারটা শেষ হলো না। কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। জারি গেয়ে মেঘের প্রার্থনার পাশাপাশি প্রকৃতি বাঁচাতে গাছ লাগানোর তাগিদ দিচ্ছিলেন তাঁরা।
দলের বেশির ভাগ সদস্যই তরুণ। তবে নেতৃত্ব দিলেন মো. আক্কাস আলী, মো. সুবাহান মিয়া, মো. লতিফ ফকিরসহ কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ। তাঁরা সবাই শ্রীপুরের গ্রামেরই মানুষ। স্থানীয় গৃহস্থ।
মেঘের জারিগানের দলটির পিছু পিছু বেশ কয়েকটি বাড়ির উঠানে যাওয়া হলো। জারির পরিবেশকদের হাতে কেউ তুলে দিলেন চাল, কেউ ডাল, অনেকে টাকা। বাড়ি বাড়ি থেকে জোগাড় করা চাল, ডাল আর নানা উপাদান দিয়ে রান্না করা হলো খিচুড়ি। সেই খিচুড়ি খেলেন সবাই মিলে উৎসব করে।
কথা হলো দলের কয়েকজন গায়কের সঙ্গে। বললেন, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে বিরল হয়ে আসা ঐতিহ্য চিনিয়ে দিতে আর পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ওদের দায়িত্ববান করে তুলতেই তাঁরা এই আয়োজনটি করেছেন। আফসোস করে তাঁরা বললেন, একসময় বৃষ্টির জন্য জারিগান ছিল একেবারে চেনা একটি দৃশ্য। অথচ বহু বছর ধরে এর কোনো আয়োজনই হচ্ছে না।
পিয়ার আলী কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আহাম্মাদুল কবীর মন্তব্য করলেন, মেঘের জারিগান পরিবেশন করে পরিবেশ বাঁচানোর বার্তা দেওয়ার ভাবনাটি অপূর্ব। এখনো যাঁরা হারিয়ে যেতে বসা জনমানুষের সংস্কৃতিচর্চাকে নিজেদের বুকে গভীর ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁরা সত্যিই অসাধারণ মানুষ।
সেই অসাধারণত্ব নিয়েই ১৩ মে আর ৬ জুন শ্রীপুরে হয়ে গেল দুটি মেঘের জারি। বৃষ্টির দেখা হয়তো এখনো মেলেনি। তবে বাসিন্দারা জানালেন, জারির আসর বসতে যাচ্ছে আবারও।