গাজীপুরের শ্রীপুরে ছয় মাস ধরে জলাতঙ্ক (র্যাবিস) টিকার তীব্র সংকট চলছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা টিকা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। নির্ধারিত সময়েও অনেকেই টিকার ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
শ্রীপুরের বাসিন্দা আলীম উদ্দীন খান (৫৫) তাঁর ১০ বছর বয়সী নাতি আলভি খানকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ফার্মেসিতে ঘুরছেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে কুকুরের আঁচড় খাওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুটিকে জলাতঙ্ক টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। এখন তৃতীয় ডোজের সময় ঘনিয়ে এলেও বাজারে টিকা পাওয়া যাচ্ছে না।
আলীম উদ্দীন বলেন, ‘মোট পাঁচটি ডোজ দিতে হবে। দুটি দিয়েছি। এখন তিন নম্বর ডোজের সময়। কিন্তু উপজেলার বড় বড় ফার্মেসিতেও ভ্যাকসিন নেই। সবাই বলছে সরবরাহ নেই।’
আরেক ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম বলেন, কুকুর তাঁকে কামড় দিয়েছিল। তিনি প্রথম ডোজ শ্রীপুর থেকে সংগ্রহ করতে পারেননি। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সংগ্রহ করেন। এখন দ্বিতীয় ডোজের জন্য কয়েক দিন ধরে ঘুরছেন; কিন্তু পাচ্ছেন না।
শ্রীপুরের ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা বলছেন, শ্রীপুরে দুই বছর আগে মাসে ৪০০ থেকে ৭০০ ভায়াল টিকার চাহিদা ছিল। এখন তা বেড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রে ৫০ ভায়ালের চাহিদা দিলে ৮ থেকে ১০ ভায়াল পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
শ্রীপুর চৌরাস্তা এলাকার ফার্মেসির মালিক মোক্তার হোসেন খান বলেন, বিড়াল বা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত একজনের জন্য পাঁচ ভায়াল টিকা লাগে। খরচ পড়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। প্রয়োজনের সময় টিকা না পেলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে। বর্তমানে টিকা পাওয়া যাচ্ছে না।
ইসলাম ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, তাঁর ফার্মেসিতে সপ্তাহে অন্তত ১০০ ভায়াল চাহিদা থাকে। এ সপ্তাহে তিনি মাত্র ১৫ ভায়াল সংগ্রহ করতে পেরেছেন। দুই দিনেই তা শেষ হয়ে গেছে।
দেশে জলাতঙ্কের টিকা উৎপাদন করে দুটি প্রতিষ্ঠান—ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস। ইনসেপ্টার গাজীপুর অঞ্চলের ভ্যাকসিন টেরিটরি ইনচার্জ ফুয়াদ হোসেন বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা খুব কম টিকা পাচ্ছি। সরকার বিভিন্ন হাসপাতাল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকা নিয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।’
স্থানীয় ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, ক্রমেই ঘরে ঘরে কুকুর ও বিড়াল পালনের প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি পথের কুকুরের সংখ্যাও বেড়েছে। এ জন্য কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা বাড়ছে এবং টিকার চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা বিজন মালাকার বলেন, জলাতঙ্কের একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। কিন্তু বাজারে সংকট থাকায় অনেকেই নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। তাঁরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, জলাতঙ্ক টিকা জেলা সদর হাসপাতাল ও সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন বরাদ্দ নেই, থাকলে ভালো হতো। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে সংকট থাকায় সরকারি হাসপাতালে চাপ বেড়েছে। এ সংকটের দ্রুত সমাধান দরকার।